আইসক্রিমে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে পোকা! হানা দিয়ে কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিল খাদ্য সুরক্ষা দফতর

গরমের দাপট বাড়তেই আইসক্রিম এখন অনেকেরই প্রিয় ঠান্ডা। কিন্তু সাধ করে কেনা আইসক্রিম খেতে গিয়ে যদি দেখেন তার ভেতর কিলবিল করছে পোকা, তাহলে কেমন লাগবে? এমনই এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন জলপাইগুড়ির শোভা বাড়ি এলাকার এক ব্যক্তি। তাঁর এই আবিষ্কার ঘিরে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা এলাকায়, আর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঘটনার তদন্তে নেমে খাদ্য সুরক্ষা এবং ক্রেতা সুরক্ষা দফতর ওই আইসক্রিম কারখানায় হানা দিয়ে সেটি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ি জেলার খড়িয়া পঞ্চায়েতের শোভা বাড়ি এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, ওই এলাকার এক বিক্রেতার কাছ থেকে একটি আইসক্রিম কিনেছিলেন অভিযোগকারী ব্যক্তি। আইসক্রিমটি মুখে দিতে যাওয়ার আগেই তিনি ভেতরে কিছু অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখতে পান। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! আইসক্রিমের ভেতরে অসংখ্য পোকা ঘোরাফেরা করছে। এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠেন তিনি। মুহূর্তেই ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হতেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়।

গ্রাহকের কাছ থেকে এমন গুরুতর অভিযোগ সামনে আসতেই স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে। জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন এবং খাদ্য সুরক্ষা ও ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা দ্রুত ওই আইসক্রিম কারখানাটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার দফতরের একটি দল ওই কারখানায় অভিযান চালায়।

কারখানার ভেতরে আধিকারিকরা যা পরিস্থিতি দেখেন, তা ছিল আরও উদ্বেগজনক। দেখা যায়, আইসক্রিম তৈরির জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না। সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর এবং নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছিল আইসক্রিম। শুধু তাই নয়, আইসক্রিমের রঙ আকর্ষণীয় করার জন্য যে রঙ ব্যবহার করা হচ্ছিল, তার অনেকেরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি কারখানার ভেতরে আইসক্রিমের পাশেই পোকা ঘুরে বেড়াতে দেখেন আধিকারিকরা।

এমন চরম অব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন দেখে খাদ্য সুরক্ষা এবং ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা তাৎক্ষণিক কঠোর পদক্ষেপ করেন। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে মজুত থাকা সমস্ত আইসক্রিম এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া বিভিন্ন কাঁচামাল আধিকারিকদের উপস্থিতিতে নষ্ট করে দেওয়া হয়। এছাড়াও, অবিলম্বে কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কারখানার মালিককে এই মর্মে একটি নোটিশও ধরিয়ে দেওয়া হয়।

এদিনের অভিযানে দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে ছিলেন জলপাইগুড়ি সদরের বিডিও মিহির কর্মকার। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আইসক্রিম তৈরির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য। কিন্তু ওই কারখানায় সেই বিধি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। তাই জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে কারখানাটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইসক্রিম তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ছাড়পত্র পেলেই তবে কারখানাটি পুনরায় চালু করার অনুমতি দেওয়া হবে। যতদিন না ছাড়পত্র মিলছে, ততদিন এটি বন্ধই থাকবে।

এদিকে, এই ঘটনা সম্পর্কে কারখানার মালিক হরিপদ রায় তাঁর অনভিজ্ঞতার কথা দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আইসক্রিমের ভেতরে কীভাবে পোকা এল অথবা আইসক্রিমে খারাপ রঙ ব্যবহার করা হয় কিনা, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে আধিকারিকদের নির্দেশ মেনে কাজ করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, কারখানার ম্যানেজারের দাবি কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, আলোয় যেসব পোকা উড়ে বেড়ায়, সেগুলিই হয়তো কোনওভাবে আইসক্রিমে পড়ে থাকতে পারে। রঙের মেয়াদ শেষ হয়নি বলেও তিনি দাবি করেছেন।

তবে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ওই কারখানার আইসক্রিমের কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সেই পরীক্ষায় আইসক্রিম নিয়ে খারাপ রিপোর্ট এসেছে। এর পরেই দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়েছে। আরও নমুনা সেন্ট্রাল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য। কারখানার মালিককে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দফতরের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে। গরমের মধ্যে আইসক্রিমে পোকা মেলার এই ঘটনায় স্থানীয়রা আতঙ্কিত এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।