“গোলি মার দিয়া, তুমহারে ভাইয়াকো..”-মণীশের অকাল মৃত্যুতে জাস্টিস চাইছে পরিবার

জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম পুরুলিয়ার ঝালদার বাসিন্দা মণীশরঞ্জন মিশ্র। কর্মসূত্রে হায়দরাবাদের বাসিন্দা হলেও তাঁর আদি বাড়ি এই ঝালদার পুরোনো বাঘমুন্ডি রোডে। দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরে ডিএসপি পদমর্যাদায় কর্মরত এই অফিসারের মৃত্যুতে ঝালদায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মণীশরঞ্জন মিশ্রের ছোট ভাই বিনীত মিশ্র ফোনের ও পারে বৌদি জয়ার ধরা গলায় যখন কথাটা শুনেছিলেন, তখনই বুঝে গিয়েছিলেন সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। বুধবার বিকেলে কাটরা যাওয়ার পথে ট্রেনে থাকার সময় বৌদির ফোনটা এসেছিল। তখনই যাত্রা বাতিল করে ঝাড়খণ্ডের ডালটনগঞ্জে নেমে পড়েন বিনীতরা এবং ঝালদা ফিরে আসেন।

জানা গেছে, মণীশরঞ্জনের বাবা মঙ্গলেশ মিশ্র ঝালদা হিন্দি হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। বিহারের সাসারাম থেকে এসে তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ঝালদার বাসিন্দা। মণীশরঞ্জন নিজেও ওই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন। স্কুলের বর্তমান শিক্ষক জগন্নাথ দাস জানিয়েছেন, বুধবার স্কুলে মণীশরঞ্জনের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

কাস্টমস বিভাগে কর্মজীবন শুরু করলেও বেশ কয়েক বছর ধরে মণীশ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরে উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। গত ১৫ এপ্রিল দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে সস্ত্রীক হায়দরাবাদ থেকে তিনি কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন। বারাণসী, অযোধ্যা, দিল্লি হয়ে কাশ্মীর পৌঁছেছিলেন তাঁরা। মণীশ–সহ পরিবারের বাকি সদস্যেরা সবাই মিলে বৈষ্ণোদেবীতে পুজো দেবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। সেই অনুযায়ী, মণীশের বাকি দুই ভাই রাহুল ও বিনীত এবং তাঁদের বাবা-মা সহ পরিবারের বাকি সদস্যেরা ট্রেনে জম্মুর কাটরা রওনা দিয়েছিলেন। পথেই পহেলগামে জঙ্গি হানার খবর পেয়ে পরিবারের সবাই আতঙ্কিত হয়ে যান এবং ঝালদা ফিরে আসেন।

মঙ্গলবার গভীর রাতে মণীশরঞ্জনের মৃত্যুর খবর ঝালদায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে পৌঁছয়। বুধবার সকাল থেকেই ঝালদার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে মণীশের বাড়ি ঘিরে পাড়া-পড়শিদের ভিড় ছিল। পাড়ার ছেলে মণীশরঞ্জনের এ ভাবে মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। সকলেই এই ঘটনার ন্যায়বিচার (জাস্টিস) দাবি করছেন।

ঠিক কী ঘটেছিল পহেলগামে? মণীশরঞ্জনের বাল্যবন্ধু মনোজ রুংটা বলেন, “যতটুকু শুনলাম, পহেলগামে মণীশ যখন ঘোড়ায় চলছিল, সে সময়ে জঙ্গিরা এসে ওকে গুলি করে। পাশে তখন দাঁড়িয়েছিল ওর স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে।” জানা গেছে, হামলার পর মণীশরঞ্জনের স্ত্রী জয়াও গুরুতর আঘাত পাওয়ায় সেখানকার একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

ঝালদার আর এক পড়শি মহেন্দ্র রুংটা মণীশরঞ্জনের পরোপকারী স্বভাবের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “কর্মসূত্রে বাইরে থাকলে কী হবে, ঝালদার কেউ যদি কোথাও কোনও সমস্যায় পড়ত ওঁর কাছে খবর পৌঁছলে পাশে দাঁড়ানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করত।” পুরনো একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ১০-১২ বছর আগে মণীশ যখন দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন, তখন তাঁর কাকার দিল্লি স্টেশনে হার্ট অ্যাটাক হয়। মণীশরঞ্জনের খুড়তুতো ভাই মণীশকে ফোন করলে তিনি দ্রুত স্টেশনে হাজির হয়ে কাকাকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। মহেন্দ্র রুংটার কথায়, “ওঁর জন্যই কাকার পুনর্জন্ম বলতে পারেন। পরোপকারী এরকম একটি ছেলের এ ভাবে জঙ্গি হানায় মৃত্যুর পরে গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠছেই।”

এই ঘটনার পর বুধবার ঝালদায় মণীশরঞ্জনের বাড়িতে ফোন করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে তিনি বলেন, “পুরুলিয়ার ভদ্রলোকের বাড়িতে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ফোন কোনও কারণে ধরতে পারেননি। তাঁর দেহ রাঁচি হয়ে গাড়িতে পুরুলিয়া আসবে। প্লেনে দেহ উঠেছে সেই খবর পেয়েছি।”

এদিন পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি নিবেদিতা মাহাতো ও বাঘমুন্ডির বিধায়ক সুশান্ত মাহাতো মণীশরঞ্জনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ও পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোও মণীশরঞ্জনের বাড়িতে এসে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

কাশ্মীরে জঙ্গি হামলায় ঝালদার ছেলের মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং ঘটনার ন্যায়বিচার দাবিতে আজ, বৃহস্পতিবার ১২ ঘণ্টা ঝালদা বন্‌ধের ডাক দিয়েছে ঝালদা নাগরিক মঞ্চ। এই নৃশংস ঘটনায় ঝালদার সর্বত্র শোক ও ক্ষোভের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।