কাশ্মীর থেকে কফিনবন্দি দেহ ফিরল বিতানের, শোকে কাতর পরিবারের সকলে

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় জঙ্গি হামলায় মর্মান্তিকভাবে নিহত কলকাতার বাসিন্দা বিতান অধিকারীর (৪০) নিথর দেহ ফিরেছে শহরে। বুধবার রাতে কলকাতা বিমানবন্দরে তাঁর কফিনবন্দি দেহ এসে পৌঁছয়। এই কফিনের সঙ্গী হয়ে ফিরেছেন তাঁর স্ত্রী সোহিনী রায় অধিকারী এবং তাঁদের তিন বছরের শিশুপুত্র হৃদান। আনন্দময় পারিবারিক ছুটি কাটাতে গিয়ে যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন তাঁরা, তার রেশ স্পষ্ট তাঁদের চোখেমুখে।
ছোট্ট হৃদান হয়তো ভিড় আগেও দেখেছে, কিন্তু এমন ভিড় আর এমন বিষণ্ণ ভাষা সে আগে শোনেনি। শ্রীনগরের হাসপাতাল হোক বা কলকাতা বিমানবন্দর, অথবা তাদের বৈষ্ণবনগরের চিরচেনা বাড়ি – সর্বত্রই ভিড় যেন তাদেরই ঘিরে। অচেনা লোকজন তাকে কোলে তুলে নিচ্ছে, কিন্তু সে কাউকেই চিনতে পারছে না। শুধু দেখছে মা সবসময়ে কেঁদেই চলেছে। ছোট্ট হৃদানের ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি যেন থমকে যাওয়া স্টিল ছবির ফ্রেম। কী হয়েছে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে। সব ঠিক থাকলে বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়িয়ে তার আজ, বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু কিছুই আর ঠিক নেই। তাই ফিরতে হলো এক দিন আগে, বুধবার রাতেই। বাবা ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে।
মঙ্গলবার দুপুরে কাশ্মীরের বৈসরন ভ্যালিতে জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান বিতান অধিকারী। বুধবার রাত ৯টা বেজে ৬মিনিটে কলকাতা পুরসভার শববাহী গাড়িতে তাঁর মরদেহ বৈষ্ণবনগরের বাড়িতে এসে পৌঁছয়। ওই গাড়িতেই ছিলেন সোহিনী এবং ছোট্ট হৃদান। তাঁদের বাড়ির সামনের ছোট্ট গলিটাতে তখন স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভিড়ে ঠাসা।
এর আগে রাত আটটা নাগাদ দমদম বিমানবন্দরে বিতানের দেহ পৌঁছলে সেখানে রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির অগ্নিমিত্রা পল, রুদ্রনীল ঘোষ-সহ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত হন। সেখানেই শোকস্তব্ধ সোহিনী দেবী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি শুভেন্দুকে বলেন, “আমার ছেলের চোখের সামনেই ওর বাবাকে মেরে ফেলল। আমি আপনার ভরসাতেই এসেছি। ও আপনাকে খুব মানত।” জবাবে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “রাজনীতির কথা বাদ দিন। আমরা মোদীর শিষ্য, এর বদলা নেব।”
মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় পুলিশ বিতানের বৈষ্ণবঘাটার বাড়িতে তাঁর মৃত্যুর দুঃসংবাদ পৌঁছে দেয়। এই বাড়িতেই বিতানের মামাতো দাদা দীপক চক্রবর্তী থাকেন। খবর পাওয়ার পরেই তিনি পাগলের মতো কাঁদছিলেন। অকৃতদার দীপকের প্রাণের চেয়েও প্রিয় এই ছোট্ট হৃদান। সোহিনী এবং হৃদান বেশিরভাগ সময় এই বাড়িতেই থাকতেন, দীপকবাবু তাঁদের দেখভাল করতেন। স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে হৃদান ভর্তি হয়েছিল। মঙ্গলবার গভীর রাতে ফোনের সোহিনীর সঙ্গে কথা হয় দীপক চক্রবর্তীর। দু’জনেই অঝোরে কেঁদেছেন। কে কাকে সান্ত্বনা দেবেন, বুঝতে পারেননি। সোহিনী বারবার একটাই কথা বলেছেন— তাড়াতাড়ি কলকাতায় ফিরতে চাই।
জানা গেছে, বিতান অধিকারীদের আদি বাড়ি পশ্চিম বর্ধমানের দু্র্গাপুরের স্টিল টাউনশিপের এ-জোনের সেকেন্ডারি রোডে। এখানকার শিবাজি বয়েজ় স্কুল থেকে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ফুলঝোড় এলাকার এক বেসরকারি কলেজ থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে বিটেক ডিগ্রি লাভ করেন। পাশ করেই একটি নামজাদা আইটি সংস্থায় যোগ দেন। বিতানের বাবা বীরেশ্বর অধিকারী দুর্গাপুর স্টিল প্লান্টে ‘হুইল অ্যান্ড অ্যাক্সেল’ বিভাগে চাকরি করতেন। অবসরের পর ২০০৮ সালে তাঁরা দুর্গাপুর থেকে কলকাতার বেহালায় চলে আসেন এবং সেখানেই বাড়ি করেন। প্রায় বছর আটেক আগে বিয়ের পরে বিতান স্ত্রী সোহিনীকে নিয়ে ফ্লরিডায় পাড়ি দেন। সোহিনীও সেখানে একটি বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি করতেন। সেখানেই তাঁদের ছেলে হৃদানের জন্ম। বছর দুয়েক আগে সোহিনী ছোট্ট হৃদানকে নিয়ে দেশে ফেরেন। বিতান ফ্লরিডাতেই ছিলেন। গত ৮ এপ্রিল তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন এবং ১৬ তারিখ সপরিবার কাশ্মীর রওনা হয়েছিলেন।
বিতানের বাবা বীরেশ্বরবাবুর বয়স ৮৭। সম্প্রতি তাঁর পেসমেকার বসেছে। এই বয়সে পুত্রের মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে বজ্রাঘাতের সামিল। বুধবার সকালে বীরেশ্বরবাবু এবং বিতানের মা মায়া অধিকারীকে পুত্রের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। সেই সময় থেকে তাঁরা সমানে কেঁদেই চলেছেন। বীরেশ্বরবাবু জানান, বিতান তাঁদের সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি বৌমাকে নিয়ে ঘুরে আসার কথা বলেন। প্রতিদিন ফোনে তাঁদের কথা হতো। বিতানের মা বলেন, নববর্ষের দিন ভিডিয়ো কল করে অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল, বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাঁর ছেলে আর নেই।
আমেরিকায় থিতু হলেও দুর্গাপুরের স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে বিতানের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বিতানের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুধবার সকালে তাঁর বাল্যবন্ধুদের অনেকেই দুর্গাপুরের স্কুলে এসেছিলেন। বিতানের এক বন্ধু বিশ্বজিৎ বর্মন বলেন, মঙ্গলবার রাতে টিভিতে বিতানের মৃত্যুর খবর দেখে তাঁরা স্তম্ভিত হয়ে যান। ২০২১ সালে বিতান শেষ দুর্গাপুরে এসেছিল। এ বার ফ্লরিডা থেকে আসার আগে ফোনে কথা হয়েছিল এবং কাশ্মীর থেকে কলকাতায় ফিরে দুর্গাপুরে আসবে বলে জানিয়েছিল। বুধবার রাতে বিতানের দুর্গাপুরের অনেক বন্ধু বৈষ্ণবনগরে এসেছিলেন তাঁদের বন্ধুকে শেষ দেখা দেখতে।
কাশ্মীরের এই জঙ্গি হামলায় এক সম্ভাবনাময় জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটল। বিতান অধিকারীর মৃত্যু তাঁর পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। ছোট্ট হৃদানের চোখে বাবার আকস্মিক অনুপস্থিতি এবং মায়ের অবিরাম কান্না এই হামলার নৃশংসতার এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছে। গোটা দেশের সঙ্গেই শোকাহত বিতানের জন্মভূমি দুর্গাপুর এবং কর্মভূমি কলকাতা।