অশান্তির মাঝে সম্প্রীতির নজির, হিন্দু বৃদ্ধের প্রাণ বাঁচাতে ছুটে এলেন দুই মুসলিম যুবক

যখন পাশের জেলায় অশান্তির ঘনঘটা, তখন সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ছবি দেখা গেল নদিয়ায়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা বয়স্ক এক হিন্দু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে রক্ত দিতে ছুটে এলেন দুই মুসলিম যুবক। রবিবার মহম্মদ হাসমাতুল্লা শেখ নামে এক যুবক প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে কৃষ্ণনগরের ব্লাড ব্যাঙ্কে এসে রক্তদান করেন। আর জাহাঙ্গীর আলম নামের আরেক যুবক ছুটে আসেন প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকে।

রোগী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা এমন আন্তরিকতা ও আত্মীয়তা পেয়ে অত্যন্ত খুশি। হাসমাতুল্লা এবং জাহাঙ্গীর দু’জনেই বলেন, “রোগী বা তাঁর কোনও আত্মীয়কে আগে চিনতাম না। কোন সম্প্রদায়ের মানুষ, কী তাঁর পরিচয়—সে সব জেনেই বা কী হবে। একজন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে হবে জেনেই আমরা রক্ত দিতে ছুটে এসেছি।”

নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানার উদয়চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী অরবিন্দ দে কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর পুত্রবধূ শ্রাবণী বলেন, “বাবার শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ভীষণ কমে গিয়েছিল। অসুস্থ হয়ে পড়ায় জেলা হাসপাতালে ভর্তি করি। চিকিৎসক দ্রুত রক্ত দেওয়ার কথা বলেন। বাবার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। দুই ইউনিট রক্তের প্রয়োজন ছিল। ব্লাড ব্যাঙ্কে পাইনি।”

তিনি আরও জানান, “শনিবার সন্ধ্যায় রক্তদাতার খোঁজে আমরা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটেছিলাম। অবশেষে এক পরিচিতর কাছে ইমার্জেন্সি ব্লাড সার্ভিস নামে রক্তদাতাদের একটি গ্রুপের সন্ধান পাই। সেখানে যোগাযোগ করার পর রবিবার এই দু’জন এসে রক্তদান করেছেন। আমরা তাঁদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।”

রক্তদাতাদের ওই গ্রুপের পরিচালক, পলাশির বাসিন্দা ওসমান গনি বলেন, “আমাদের গ্রুপের এক সদস্যের কাছে ফোন এসেছিল। আমরা দ্রুত দু’জনকে পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা এসে রক্ত দিয়েছেন। মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে আমাদের বন্ধুরা সারা বছরই দ্রুত ছুটে যান।”

নাকাশিপাড়ার সোনাডাঙা গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় গৃহশিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “শনিবার রাতে খবরটা পাই। রবিবার সকালে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে ছুটে এসে রক্ত দিয়েছি।” অন্যদিকে, কালিগঞ্জ থানার পালিতবেগিয়া পঞ্চায়েতের শান্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ হাসমাতুল্লা শেখও রবিবার ছুটে আসেন শক্তিনগরে রক্ত দিতে। হাসমাতুল্লা পেশায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পার্শ্বশিক্ষক।

এদিন হাসমাতুল্লা বলেন, “খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে আসি রক্ত দিতে। রক্ত দেওয়ার পর মনে হলো, রোগীকে একবার দেখে যাই। আগে কোনও পরিচয় ছিল না। তবুও মনে হলো যেন আত্মীয়। এক সঙ্গে একটা ছবিও তুলেছি মানুষটার সঙ্গে। মুর্শিদাবাদে এখন তুমুল অশান্তি চলছে। এ সবে লাভ নেই। মানুষের বিপদে পাশে থাকতে চাই।”

এই ঘটনা প্রমাণ করে, যখন চারপাশে বিদ্বেষ ও হানাহানির খবর, তখনও মানবতা ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রয়েছে। দুই অচেনা মুসলিম যুবকের এই নিঃস্বার্থ রক্তদান শুধু একজন বৃদ্ধের জীবন বাঁচাল না, একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও স্থাপন করল।