অতিরিক্ত গরম থেকে মাইক্রোচিপকে বাঁচাবে নতুন এক উপায়, জেনেনিন বিস্তারিত

বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সুপার কম্পিউটার পর্যন্ত বিদ্যুচ্চালিত ডিভাইসগুলো ক্রমশ আরও ছোট এবং একইসঙ্গে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হওয়ার সমস্যাও বাড়ছে, যা এই ডিভাইসগুলোর কর্মক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত তাপ কর্মসক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে, চিপ ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষতি করতে পারে, এমনকি পুরো ডিভাইসটিকেই নষ্ট করে দিতে পারে বলে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সমস্যার মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা একটি নতুন এবং অত্যন্ত কার্যকর উপায় খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। জাপানের ইউনিভার্সিটি অফ টোকিওর গবেষকরা ইলেকট্রনিক চিপকে অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে বাঁচাতে এক উন্নত শীতলকরণ পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা এই ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এই গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সেল রিপোর্টস ফিজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, তাঁরা আরও স্মার্ট ও কার্যকর উপায়ে পানি ব্যবহার করে বিভিন্ন চিপকে ঠান্ডা রাখার নতুন এক উপায় দিয়েছেন। বর্তমানের প্রচলিত সেরা শীতল কৌশলগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, বিভিন্ন মাইক্রোচ্যানেলের ব্যবহার, যা সরাসরি চিপের মধ্যে নির্মিত ছোট আকারের পানিভরা বিভিন্ন নল। এসব মাইক্রোচ্যানেলের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি তাপ শোষণ করে ও তা বহন করে নিয়ে যায়। তবে এ পদ্ধতির অসুবিধা হচ্ছে, এটি কেবল ‘সেন্সিবল হিট’ বা বোধগম্য তাপ ব্যবহার করে। এর মানে হচ্ছে, পানির তাপমাত্রা বাষ্পে পরিণত হওয়ার আগের ধাপ পর্যন্ত যতটা তাপ শোষণ করা সম্ভব, ততটুকুই এ পদ্ধতিতে করা যায়।

গবেষকদের উদ্ভাবিত নতুন পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, চিপের ভেতরের তাপমাত্রা ব্যবহার করে পানিকে ফোটানো বা বাষ্পীভূত হতে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি শক্তি শোষণ করা সম্ভব। একে ‘সুপ্ত তাপ’ বা ল্যাটেন্ট হিট বলা হয় এবং এটি কেবল পানির তাপমাত্রা বাড়ানোর চেয়ে চিপের তাপ অপসারণে প্রায় সাত গুণ বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে চিপের ভিতরে পানি ফোটানো বা বাষ্পীভবন তৈরি করার একটি জটিলতা হলো, এটি বুদবুদ তৈরি করে যা ছোট ছোট চ্যানেলগুলিকে ব্লক করতে পারে এবং শীতলকরণের সক্ষমতা কমিয়ে আনতে পারে।

এ সমস্যা সমাধানের জন্য ইউনিভার্সিটি অফ টোকিওর গবেষণা দলটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা কৌশিক কাঠামো (capillary structure) সহ একটি থ্রি ডি কুলিং সিস্টেম তৈরি করেছে। এটি একটি ক্ষুদ্র পথ যা নিয়ন্ত্রণ করে পানি কীভাবে চলে ও বাষ্পীভূত হয়। এসব চ্যানেলের জন্য বিভিন্ন আকার ও নকশা পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, কুলিং সিস্টেমের জ্যামিতি কতটা ভালভাবে কাজ করে তার ওপর বড় প্রভাব ফেলে এটি। চিপ তৈরিতে পানি প্রবাহ ও বুদবুদ গঠন উভয়কেই সাবধানতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে তারা এই নতুন পদ্ধতির সক্ষমতাকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

গবেষকরা বলছেন, তাদের নতুন কুলিং সিস্টেমটি ১০৫ পর্যন্ত কোএফিশিয়েন্ট অফ পারফরম্যান্স (COP) অর্জন করেছে, যা পুরানো পদ্ধতির তুলনায় একটি বড় উন্নতি। এর মানে হচ্ছে, একই পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে এটি আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে চিপকে শীতল করতে পারে।

এই গবষণার জ্যেষ্ঠ লেখক মাসাহিরো নোমুরা বলেছেন, স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সুপার কম্পিউটার পর্যন্ত ভবিষ্যতের উচ্চ-কার্যক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন ডিভাইসের জন্য আরও ভালো শীতলকরণ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এই প্রযুক্তি শক্তির ব্যবহার কমাতে ও কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতেও সাহায্য করতে পারে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোকে আরও শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং শক্তি-সাশ্রয়ী করে তোলার পথ খুলে দিয়েছে।