বিশেষ: ২৫ এপ্রিল সত্যিই কী দেখা যাবে হাসিমুখের চাঁদ? জেনেনিন আসল ঘটনা কী?

সোশ্যাল মিডিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে একটি ছবি ব্যাপক ভাবে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে আগামী ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে আকাশে একটি বিরল ও সুন্দর দৃশ্য দেখা যাবে— একটি হাসিমুখে চাঁদের। ছবিতে একটি সরু বাঁকা চাঁদের ঠিক উপরে দুটি উজ্জ্বল গ্রহকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যা দেখতে অনেকটা মানুষের হাসিমুখের মতো। এই ছবি ঘিরে নেটমাধ্যমে যেমন মুগ্ধতা তৈরি হয়েছে, তেমনই প্রশ্ন উঠেছে এর সত্যতা নিয়ে। জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল এবং প্রচারিত ছবিটি বাস্তব ঘটনার প্রতিফলন নয়।

প্রকৃতপক্ষে, ২৫ এপ্রিল ভোর হওয়ার আগে পূর্ব দিগন্তের দিকে তাকালে আকাশে একটি সরু পুরোনো চাঁদ দেখা যাবে। অমাবস্যার মাত্র দুই দিন বাকি থাকায় সেদিন চাঁদের প্রায় ১২ শতাংশ আলোকিত অংশই কেবল দৃশ্যমান থাকবে। পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত আলোয় চাঁদের অন্ধকার অংশটিও আবছাভাবে দেখা যেতে পারে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ‘আর্থশাইন’ নামে পরিচিত। তবে প্রচারিত ছবিতে যেমন চাঁদের অন্ধকার অংশের ঠিক উপরে দুটি গ্রহকে চোখের মতো উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব দৃশ্য তেমনটা হবে না।

সেদিন চাঁদের কাছাকাছি দুটি উজ্জ্বল গ্রহ থাকবে ঠিকই। শুক্রগ্রহ উদয় হবার পরপরই চাঁদের উদয় হবে। শুক্রগ্রহ পৃথিবী থেকে দেখলে সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ, কারণ এটি পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি এবং এর বায়ুমণ্ডল খুব প্রতিফলক। এরপরে আকাশে দেখা যাবে অনেক বেশি ম্লান ‘দ্বিতীয় চোখ’ শনি গ্রহকে। শনি, শুক্র এবং সরু চাঁদ— এই তিনটি জ্যোতিষ্ক সেদিন আকাশে একটি ত্রিভুজ তৈরি করবে, যা দেখতে সুন্দর লাগবে। কিন্তু গ্রহগুলো চাঁদের অন্ধকার প্রান্তের উপরের দিকে উঁকি না দিয়ে চাঁদের আলোকিত অংশের কিছুটা পাশে অবস্থান করবে। এই দৃশ্যটি কোনোভাবেই ‘হাসিমুখ’ চাঁদের মতো দেখাবে না। যদিও এর কাছাকাছি বুধ এবং নেপচুনও দিগন্তের কাছে অবস্থান করবে, তবে সূর্যোদয়ের আগের আলোর আভার কারণে তাদের কম উজ্জ্বলতার জন্য খালি চোখে দেখা যাবে না।

নেটমাধ্যমে প্রচারিত অপর একটি পোস্টে ১৬ মে ২০২৫ তারিখে সন্ধ্যার আকাশে হাসিমুখের চাঁদ দেখতে পাওয়ার দাবি করা হচ্ছে। তবে এখানে দেখানো ছবিতে শুক্রগ্রহ ও শনিগ্রহের পরিবর্তে বৃহস্পতিগ্রহকে দেখানো হয়েছে। এই দাবিও ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। ১৬ মে তারিখে বৃহস্পতিগ্রহ সূর্যাস্তের পরে পশ্চিম আকাশে দৃশ্যমান থাকবে, অপরদিকে শুক্রগ্রহ সূর্যোদয়ের আগে দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে থাকবে। ফলে এই দুটি গ্রহ একসঙ্গে চাঁদের কাছাকাছি এসে ‘হাসিমুখ’ তৈরি করার কোনো সম্ভাবনা নেই। সেদিন অর্ধচন্দ্র কোনও গ্রহের কাছাকাছি থাকবে না।

জ্যোতির্বিদ এবং ফ্যাক্ট-চেকারদের মতে, এই ধরনের ভুয়ো ছবির প্রচার সম্ভবত মহাকাশে গ্রহদের অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া এপ্রিল ফুল দিবসের একটি নিবন্ধের সিরিজ থেকে শুরু, যেখানে এটি দেখতে কেমন হতে পারে তার একটি সিমুলেটেড চিত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, এই পোস্টটি অনেক নামী সংবাদ সংস্থা এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক কিছু ওয়েবসাইটকেও বিভ্রান্ত করেছে এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

সুতরাং, ২৫ এপ্রিল ভোরে আকাশে চাঁদ, শুক্র এবং শনির একটি সুন্দর ত্রিভুজ দেখা যাবে ঠিকই, কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ভাইরাল হওয়া ‘হাসিমুখ’ চাঁদের ছবির মতো হবে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই বাস্তব সুন্দর দৃশ্যটি উপভোগ করাই শ্রেয়, কোনো ভুয়ো ছবি দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে।