প্রতিদিন কটি ডিম খাওয়া নিরাপদ? কুসুম খাওয়া কি সত্যিই ক্ষতিকর? জানুন চিকিৎসকদের আসল সত্যটা

ডিমকে ঘিরে বরাবরই জনমানসে নানা বিতর্ক ও সংশয় রয়েছে। অতীতে উচ্চ কোলেস্টেরলের আশঙ্কায় বহু মানুষই খাদ্যতালিকা থেকে ডিমের কুসুম বা আস্ত ডিম বাদ রাখতেন। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও গবেষণায় ডিমকে অন্যতম সেরা ও স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি আদৌ নিরাপদ? কুসুম বাদ দেওয়া উচিত নাকি সমেত খাওয়া ভালো? ভাজা ডিমের তুলনায় সেদ্ধ ডিম কতটা পুষ্টিকর? কিংবা দিনে কটি ডিম খাওয়া উচিত? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিতভাবে।
ডিমের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা
ডিমকে কেন ‘নিউট্রিশন পাওয়ারহাউস’ বা পুষ্টির ভাণ্ডার বলা হয়, তার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। একটি মাঝারি বা বড় সাইজের ডিমে প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের ৯টি প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে, যা এটিকে একটি সম্পূর্ণ প্রোটিনে পরিণত করে। এছাড়া ডিম কোলিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের অন্যতম সেরা উৎস।
অনেকেই ওজন বা কোলেস্টেরল বাড়ার ভয়ে ডিমের কুসুম ফেলে দেওয়ার বড় ভুলটি করেন। অথচ ডিমের কুসুমেই ভিটামিন এ, ডি, ই এবং বি১২-এর মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন লুকিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, ডিমে উপস্থিত কোলিন, লুটেইন এবং জিয়াজ্যান্থিনের মতো পু উপাদানগুলি মানুষের মস্তিষ্ক এবং চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
দিনে কটি ডিম খাওয়া উচিত?
সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রযোজ্য না হলেও, এক্ষেত্রে পরিমিতিবোধই হলো মূল চাবিকাঠি। সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেতে পারেন। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য একটি ডিম খাওয়া দারুণ উপকারী। তবে যাঁদের ইতিমধ্যে হৃদরোগ বা উচ্চ এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের একটি গবেষণা সমীক্ষায় জানানো হয়েছে যে, অধিকাংশ সুস্থ ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম খাওয়া হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর নয়।
ডিম খাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপায় ও সতর্কতা
আপনি কীভাবে ডিম রান্না করছেন, তার ওপর এর পুষ্টিগুণ বহুলাংশে নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেদ্ধ ডিম, পোচ করা ডিম বা সামান্য তেলে হালকা সেঁকে নেওয়া ডিম খাওয়া সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, কারণ এতে অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট যোগ করার প্রয়োজন হয় না। এছাড়া কাঁচা বা আধো-সেদ্ধ ডিম খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ ডিম পুরোপুরি রান্না করলে প্রোটিন সহজে শরীরে শোষিত হয় এবং খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমে যায়। ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, ওটস বা পুষ্টিকর শস্যদানা রাখলে তা খাবারে ফাইবারের জোগান দেয়, যা ডিমের পুষ্টিমান আরও বাড়িয়ে দেয়।
ডিম কি সত্যিই হৃদপিণ্ডের জন্য ক্ষতিকর?
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো যে ডিমে থাকা উচ্চ ডায়েটারি কোলেস্টেরল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলি এই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় না। তবে ডিমের সঙ্গে আপনি কী খাচ্ছেন, সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস, তেল-মশলাযুক্ত খাবার বা অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত উপাদানের সঙ্গে ডিম খাওয়ার বদলে শাকসবজি ও স্বাস্থ্যকর শস্যের সঙ্গে ডিম খাওয়া শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী।