কালীপুজোয় কোথায় কোথায় যাবেন? উত্তর থেকে দক্ষিণ— বাংলার সেরা ও জাগ্রত মণ্ডপের ‘আলটিমেট’ গাইড!

বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর তালিকায় দীপান্বিতা অমাবস্যা বা কালীপুজোর স্থান অনন্য। শহরের সাবেকি ও জাগ্রত মন্দিরগুলির আধ্যাত্মিক পরিবেশ থেকে শুরু করে জেলা ও বারোয়ারি মণ্ডপগুলির তাক লাগানো আলোকসজ্জা—সব মিলিয়ে অমাবস্যার রাতে অন্য রূপ নেয় বাংলা। এই উৎসবের মরশুমে শহরের সেরা সাবেকি মন্দির থেকে শুরু করে উত্তর-দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও জেলার বিখ্যাত পুজোমণ্ডপগুলির সম্পূর্ণ গাইড রইল নিচে।

১. কলকাতার জাগ্রত ও সাবেকি পুজো
কালীঘাট কালীমন্দির (দক্ষিণ কলকাতা):

৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রধান স্থান কালীঘাটে কালীপুজোর রাতে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়। এই তিথিতে দেবী কালীকে এখানে ‘মহালক্ষ্মী’ রূপে আরাধনা করার প্রাচীন প্রথা রয়েছে।

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির (উত্তর শহরতলি):

১৮৫৫ সালে রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে মা ভবতারিণীর আরাধনা দেখতে অমাবস্যার রাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। হুগলি নদীর তীরে আলো ঝলমলে মন্দির প্রাঙ্গণ রাতে এক মোহময় রূপ নেয়।

জানবাজার সম্মিলিত কালীপুজো সমিতি (এসপ্ল্যানেড):

মধ্য কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় ও জমকালো পুজো এটি। অভিনব মণ্ডপসজ্জা ও নান্দনিক আলোর কারসাজিতে প্রতি বছরই নজর কাড়ে এই কমিটি।

ফাটাকেষ্টর কালীপুজো (কলেজ স্ট্রিট):

উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিখ্যাত বারোয়ারি পুজোর কথা উঠলেই ‘নব যুবক সঙ্ঘ’-এর এই পুজোর নাম আসে। ১৯৫৭ সালে কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর হাতে সূচিত এই পুজোর মূল আকর্ষণ বিশাল আকারের প্রতিমা এবং জাকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা।

২. নৈহাটির ‘বড়মা’ ও বারাসাত-মধ্যমগ্রামের থিমের দুনিয়া

নৈহাটির বড়মা কালী (উত্তর ২৪ পরগনা):

নৈহাটি অরবিন্দ রোডের ‘বড়মা’ কালীপুজোর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় ২১-২২ ফুট উচ্চতার বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণা দেবীপ্রতিমা এবং গায় জড়িয়ে থাকা প্রচুর সোনা-রুপোর অলঙ্কার দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। “ধর্ম যার যার, বড়মা সবার”—এই বিশ্বাসেই এই রাতে নৈহাটিতে উপচে পড়ে অগণিত মানুষের ভিড়।

কে.এন.সি রেজিমেন্ট (বারাসাত):

বারাসাতের পুজো পরিক্রমায় কে.এন.সি রেজিমেন্ট অন্যতম সেরা আকর্ষণ। প্রতি বছর বিশ্বখ্যাত স্থান বা প্রাসাদের আদলে বিশাল মণ্ডপ তৈরি করে তারা দর্শকদের চমকে দেয়।
নবপল্লী অ্যাসোসিয়েশন ও নবপল্লী ব্যায়াম সমিতি (বারাসাত):

বারাসাত স্টেশনের কাছে নবপল্লীর এই দুই পুজো কমিটির মধ্যে প্রতি বছরই চলে সৃজনশীলতার টেক্কা। সামাজিক বার্তা থেকে কাল্পনিক জগত—উভয় থিমই চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে এদের পুজোয়।

শ্রীনগর ৩ নম্বর অধিবাসীবৃন্দ (মধ্যমগ্রাম):

বাদু রোড সংলগ্ন মধ্যমগ্রামের এই পুজোটি বিশাল বাজেট, চমৎকার আলোকসজ্জা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার জন্য দর্শনার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৩. জেলার বিখ্যাত শাক্তপীঠ ও ঐতিহ্যবাহী পুজো

তারাপীঠ (বীরভূম):

সাধক বামাক্ষ্যাপার স্মৃতিবিজড়িত এই তীর্থক্ষেত্রে কালীপুজোর রাতে বিশেষ নিশিপূজা ও মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বারকা নদের পাড়ে মহাশ্মশান ও মন্দির প্রাঙ্গণে এই রাত কাটানো এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

কঙ্কালীতলা (বোলপুর, বীরভূম):

কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম এই স্থানে দেবীর কোনও মূর্তি থাকে না; পটে এঁকে আরাধনা করাই এখানকার নিয়ম। নিঝুম রাতে এখানকার শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ ভক্তদের মন ছুঁয়ে যায়।

তমলুকের বর্গভীমা মন্দির (পূর্ব মেদিনীপুর):

প্রাচীন এই মহাপীঠে কালীপুজোর দিনে বিশেষ আরাধনা ও মেলার আয়োজন হয়, যা সমগ্র মেদিনীপুরবাসীর আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

শান্তিপুর (নদিয়া):

নদিয়ার শান্তিপুরের শতবর্ষ প্রাচীন ‘আগমেশ্বরী’ কালীপুজোর ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তন্ত্রমতে আরাধনা এবং দেবীর বিশেষ রূপ দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ভিড় জমান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *