দিল্লির বস্তি থেকে আমেরিকার মেয়র! কেরালার মেয়ের ঐতিহাসিক জয়ে কাঁপছে লস অ্যাঞ্জেলেস

একসময়ে দিল্লির অবহেলিত বস্তিগুলিতে ঘুরে সাধারণ মানুষের না বলা কষ্টের কথা শুনতেন তিনি। কারও মাথার ওপর থেকে ছাদ কেড়ে নেওয়ার ভয়, তো কারও আবার এক ফোঁটা পানের জলের জন্য তীব্র হাহাকার। সমাজের সেই বঞ্চিত মানুষের যন্ত্রণাদায়ক লড়াই আর নিদারুণ বাস্তব চিত্রই তাঁর জীবনদর্শন এবং শহর ও নাগরিক জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। আর আজ? সেই সুপরিচিত রাজনীতিবিদ নিত্যা রমন (Nithya Raman) আমেরিকার অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের (Los Angeles) মেয়র নির্বাচনে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নিলেন। ২০২৬ সালের মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনের এই অভূতপূর্ব ফলাফল বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে তাঁকে। কেরালা থেকে আমেরিকা এবং তার মাঝে দিল্লির ঘিঞ্জি বস্তি—কীভাবে তৈরি হলো এই অবিশ্বাস্য ও অনুপ্রেরণাদায়ক রাজনৈতিক যাত্রাপথ?
কেরালার ত্রিশূরে ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন নিত্যা রমন। তাঁর বাবা ভেঙ্কটরমন এবং মা সুধা কেচেরি। জীবনের প্রথম দিকের কিছু সময় তিরুবনন্তপুরমে কাটার পর মাত্র ছ’বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সুদূর আমেরিকায় পাড়ি দেন তিনি। সেখানেই তাঁর পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা। তবে তাঁর জীবনের মূল গল্প শুধুমাত্র বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষা লাভ বা বড় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নয়, বরং সাধারণ মানুষের অধিকারের লড়াইয়ের গল্প। আমেরিকার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে সোশ্যাল স্টাডিজ়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন নিত্যা। কিন্তু শহরের প্রান্তিক মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করেন, কোথায় তাঁদের মূল সমস্যা এবং কেন বহু মানুষ মৌলিক নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন—এই প্রশ্নগুলি তাঁকে সবসময় তাড়িত করত। সেই গভীর সমাজচেতনা ও আগ্রহই তাঁকে একসময় ভারতের মাটিতে ফিরিয়ে এনেছিল।
২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসের পূর্বমুহূর্তে দিল্লির বহু বস্তিবাসী মানুষের মাথায় উচ্ছেদের খাড়া নেমে এসেছিল। সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কাছ থেকে তাঁদের নিদারুণ সমস্যাগুলি প্রত্যক্ষ করেন নিত্যা। ঘর হারানোর তীব্র আতঙ্ক, সুপেয় জলের মারাত্মক অভাব, শৌচাগারের অপ্রতুলতা এবং শহরের কথিত চকচকে উন্নয়নের আড়ালে থাকা নির্মম বাস্তব ছবিগুলি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। পরবর্তীকালে ২০১০ সালে চেন্নাইয়ে ফিরে তিনি ‘Transparent Chennai’ নামক একটি অভিনব উদ্যোগ শুরু করেন। শহরের কোন এলাকায় শৌচাগার নেই, কোথায় বাস পরিষেবা অপ্রতুল এবং কোন কোন অঞ্চলে মৌলিক নাগরিক পরিষেবার মারাত্মক অভাব রয়েছে—এই সমস্ত দরকারি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। মূলত শহর পরিকল্পনা বা আর্বান প্ল্যানিংয়ে সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
এরপর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT) থেকে নগর পরিকল্পনা বা আরবান প্ল্যানিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নিত্যা। ২০১৩ সালে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান। সেখানে স্থানীয় প্রশাসন এবং নানা নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি, শহরের অসহায় গৃহহীন বা হোমলেস মানুষদের জীবনযাপন এবং তাঁদের জরুরি সাহায্যের ব্যবস্থা করার বিষয়েও নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেন। ২০১৭ সালে ‘SELAH Neighborhood Homeless Coalition’ গঠনে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গৃহহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা ছিল এই কাজের মূল উদ্দেশ্য। সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে স্থানীয় স্তরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন নিত্যা এবং একসময় প্রবেশ করেন রাজনীতির ময়দানে।
২০২০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে অভাবনীয় জয় অর্জন করেন তিনি এবং ২০২৪ সালেও পুনর্নির্বাচিত হন। আবাসন সংকট সমাধান, গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন এবং সার্বিক নাগরিক পরিষেবার আধুনিকীকরণ ছিল তাঁর কাজের মূল চালিকাশক্তি। এই দীর্ঘ ও সফল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁকে মেয়র পদ অর্জনের লড়াইয়ে অন্যতম শক্তিশালী করে তোলে। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত মিডটার্ম নির্বাচন। কংগ্রেসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও শহরেও একযোগে মেয়র ও অন্যান্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই উত্তপ্ত নির্বাচনী আবহেই লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র পদে তৎকালীন মেয়র কারেন বাসকে (Karen Bass) জোরদার টক্কর দেন নিত্যা। সাম্প্রতিক ভোট গণনার প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নিত্যা রমন ৫২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, যেখানে কারেন বাস পেয়েছেন ৪৭.৩০ শতাংশ। ভোটের এই ব্যবধানে কারেন বাস নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক জয়ের ফলেই আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের পরবর্তী মেয়র হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই লড়াকু নেত্রী।