আলুর দাম নিয়ন্ত্রণে রাজ্য সরকারের মাস্টারস্ট্রোক! পাইকার বোঝালেন বাস্তবে কতটা লাভ?

রাজ্যের আলু বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের পকেট বাঁচাতে এবার একগুচ্ছ বড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। ভিন্রাজ্যে আলু পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্ত বাধা তুলে নেওয়া, পরিবহণে কুইন্টাল-পিছু ৫০ টাকা ভর্তুকি প্রদান এবং হিমঘরগুলিকে মার্কেট ইয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। সরকারের এই ত্রিফলা পদক্ষেপে ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রশ্ন উঠছে যে, এর ফলে কি আলুচাষিরা তাঁদের ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন? নাকি সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি অধরাই থেকে যাবে?
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র ভিন্রাজ্যের সীমান্ত খুলে দিলেই আলুর বাজারের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য উৎপাদন, মজুতদারি, পরিবহণ এবং বাজারের চাহিদার মধ্যে নিখুঁত সমতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শেওড়াফুলি-শ্রীরামপুর এলাকার বিশিষ্ট আলু ব্যবসায়ী ও আড়তদার অভিষেক সরকারের মতে, আলুর বাজার কেবল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোন সময়ে বাজারে কত পরিমাণ আলু আসছে, হিমঘরগুলিতে কতটা মজুত রয়েছে এবং বাজারে প্রকৃত চাহিদা কেমন—এই সমস্ত বিষয়ের ওপরই পণ্যের দাম ওঠানামা করে।
অন্য রাজ্যে আলু পাঠাতে পারাটা নিঃসন্দেহে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সুযোগ এবং এর ফলে তাঁরা আরও বড় বাজার পাবেন। তবে শুধু বাইরে পাঠালেই হবে না, পরিবহণ খরচের হিসাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সরকার কুইন্টাল-পিছু ৫০ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা করেছে, তবুও ভিন্রাজ্যের বাজারে গিয়ে যদি কাঙ্ক্ষিত দাম না মেলে, তবে সেই আলু বাইরে পাঠানোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ অন্য রাজ্যে পাঠালেই যে সেখানকার চাহিদা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গত মরশুমে রাজ্যে প্রায় ১৪০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন আলু হিমঘরে মজুত করা হয়েছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মাত্র ৪৮ লক্ষ মেট্রিক টন আলু কোল্ড স্টোরেজ থেকে বাইরে এসেছে। বাকি প্রায় ২৭ লক্ষ মেট্রিক টন আলু নিয়ে এখন বড় ধরনের দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। অভিষেক সরকারের মতে, কোল্ড স্টোরেজে মজুত আলুর জন্য যদি হঠাৎ করে কোনো কড়া ডেডলাইন বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, তবে বাজারে এক ধাক্কায় আলুর জোগান অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বাজারে আলুর দাম মারাত্মকভাবে পতন হতে পারে, যা চাষি ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই নতুন আলু বাজারে আসার আগেই পুরনো আলু সঠিকভাবে নিষ্কাশন করা প্রয়োজন।
পাইকারি বাজারে এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মকভাবে পড়ে। হিমঘর থেকে আলু বের করার খরচ, পরিবহণ এবং আড়তের কমিশন—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের নিট লাভের অঙ্ক অনেকটাই কমে যায়। তাই আলু বের করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। পাশাপাশি, বর্তমান বাজারের চাহিদার দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। সড়ক বা রেলপথে আলু পরিবহণে কুইন্টাল-পিছু ৫০ টাকার আর্থিক ভর্তুকি দূরের বাজারে মাল পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা অনেকটাই দূর করবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই রাজ্যের স্থানীয় বাজারের দাম কেমন থাকছে, তার ওপরই নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের লাভ-ক্ষতি এবং বাজারের আসল ভবিষ্যৎ।