পদ ছাড়ছেন স্পিকার মাইক জনসন, নেতৃত্ব নিয়ে চরম টানাপোড়েন শুরু রিপাবলিকান শিবিরে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরণের ওলটপালট ঘটেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি এখন চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। নির্বাচনের এই অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতা বা স্পিকার হিসেবে আর থাকতে চাইছেন না বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন।

গত বুধবার সকালে নিজের ঘনিষ্ট কর্মীদের সাথে ফোনালাপে এই চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তের কথা জানান মাইক জনসন। বিশ্বস্ত চারটি সূত্রের বরাতে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করে রিপাবলিকানরা। এর ফলে আসন্ন নতুন কংগ্রেসে দলটির বিরোধীদলীয় নেতার পদটি শূন্য হতে চলেছে। আগামী ১০ নভেম্বর দলের অভ্যন্তরীণ গোপন বা প্রকাশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য নতুন নেতা বেছে নেওয়া হবে।

জনসনের সরে দাঁড়ানোর আকস্মিক ঘোষাণার পরই রিপাবলিকান পার্টির অন্দরে উত্তরসূরি হওয়ার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার দৌড়ে ইতোমধ্যে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন দলটির দুই অত্যন্ত প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা। তাদের মধ্যে একজন হলেন প্রতিনিধি পরিষদের বিদায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্টিভ স্ক্যালিস এবং অন্যজন বিচার বিভাগীয় কমিটির শক্তিশালী চেয়ারম্যান জিম জর্ডান। গত বুধবার দলীয় সহকর্মীদের কাছে পাঠানো পৃথক চিঠিতে দুজনেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রার্থিতার কথা ঘোষণা করেছেন।

লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত স্টিভ স্ক্যালিস বিদায়ী স্পিকার মাইক জনসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। সহকর্মীদের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল তাদের আশানুরূপ বা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ হয়েছে। তবে এই চরম প্রতিকূলতা কাটিয়ে দলকে পুনরায় সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, ওহাইও অঙ্গরাজ্যের প্রভাবশালী প্রতিনিধি জিম জর্ডানও বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারে তিনি একসময় হাউজের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের প্রভাবশালী সংগঠন ‘ফ্রিডম ককাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবেও তার সুপরিচিতি রয়েছে। সহকর্মীদের কাছে পাঠানো বার্তায় জিম জর্ডান দাবি করেছেন যে, ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। বিরোধী দলে থেকেও কীভাবে রিপাবলিকান শিবিরকে ঐক্যবদ্ধ ও লড়াকু রাখা যায়, সে বিষয়ে তার সম্যক অভিজ্ঞতা আছে। একই সঙ্গে, ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো পদক্ষেপ ও আগ্রাসন সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য দলের নেতৃত্বকে আরও বেশি সক্রিয় ও সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এদিকে নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর খোদ রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও পরিবর্তনের জোরালো দাবি উঠেছে। দলের একাধিক ক্ষুব্ধ আইনপ্রণেতা বর্তমান নেতৃত্বের পুরো কাঠামো ভেঙে নতুন করে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্লোরিডার প্রতিনিধি গ্রেগ স্টিউব বর্তমান নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন যে, তারা দলের রক্ষণশীল ভোটার ও সমর্থকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

শুধু বিরোধীদলীয় নেতার পদেই নয়, বরং রিপাবলিকান পার্টির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদেও বড় পরিবর্তনের স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে। টেক্সাসের বিশিষ্ট প্রতিনিধি ও রিপাবলিকান স্টাডি কমিটির চেয়ারম্যান অগাস্ট পফ্লুগার দলের গুরুত্বপূর্ণ হুইপ পদে টম এমারের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন। উল্লেখ্য, এই হুইপ পদটি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় রিপাবলিকানদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে কেভিন ম্যাকার্থিকে স্পিকারের পদ থেকে নাটকীয়ভাবে অপসারণ করার পর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন মাইক জনসন। এরপর দীর্ঘ দুই মেয়াদে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি এই স্পিকারের দায়িত্ব পালন করে এলেও বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দলের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাকে সরে দাঁড়াতে হচ্ছে। আগামী দিনে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *