৫০০ বছরের অলৌকিক ইতিহাস! বালুরঘাটের তহবাজারে আজও কীভাবে ভক্তদের মানত পূরণ করেন জাগ্রত ‘শ্রীশ্রী বুড়ামা’?

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার জেলা সদর বালুরঘাটের প্রাণকেন্দ্র তহবাজার এলাকা। আর এই ব্যস্ততম বাণিজ্য কেন্দ্রের ঠিক মাঝখানেই বিরাজ করছেন সাড়ে পাঁচশত বছরের প্রাচীন ও অত্যন্ত জাগ্রত দেবী ‘শ্রীশ্রী বুড়ামা কালী’। ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো জনশ্রুতি, বংশপরম্পরায় চলে আসা অগাধ বিশ্বাস আর একের পর এক অলৌকিক কাহিনীর ভরকেন্দ্রে থাকা এই পুজো আজও উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে যখন আলোয় সেজে ওঠে শহর, তখন বুড়ামা কালীমন্দিরে ঢল নামে হাজার হাজার ভক্তিপ্রাণ পুণ্যার্থীর। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মা কালীর কাছে নিষ্ঠা ভরে যা-ই প্রার্থনা করা হোক না কেন, দেবী কাউকেই খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।
৫০০ বছরের পুরনো অলৌকিক ইতিহাস ও শুভ সূচনা
স্থানীয় প্রাচীন জনশ্রুতি ও প্রবীণদের বিবরণ অনুযায়ী, সাড়ে পাঁচশত বছর আগে যখন এই এলাকা ঘন জঙ্গল ও আত্রেয়ী নদীর সংলগ্ন জলাভূমিতে ঢাকা ছিল, তখন থেকেই এখানে মায়ের আরাধনা শুরু হয়। কথিত আছে, তৎকালীন সময়ে এক সাধক নদীর চরে বটবৃক্ষের নিচে মায়ের আধিভৌতিক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন এবং পরবর্তীতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে মা কালীর মাটির বিগ্রহ তৈরি করে পুজো শুরু করেন।
সেই থেকে শুরু হয়ে আজও অবিরত ধারায় চলে আসছে আরাধনা। সময়ের সাথে সাথে জঙ্গল কেটে শহর গড়ে উঠেছে, মাটির ছোট বেদি থেকে আজ তৈরি হয়েছে সুবিশাল ও সুদৃশ্য মন্দির। কিন্তু মায়ের আদি রূপ ও অলৌকিক মাহাত্ম্য বজায় রয়েছে ঠিক আগের মতোই।
জাগ্রত দেবীর অলৌকিক মহিমা ও মানত
বালুরঘাটের বুড়ামা কালীকে ঘিরে এলাকার মানুষের মনে রয়েছে গভীর ও অবিচল আস্থা। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, রোগমুক্তি, ব্যবসায় সাফল্য কিংবা বিপদে-আপদে মায়ের দুয়ারে এসে মানত করলে তা অলৌকিকভাবে পূরণ হয়।
প্রতি বছর কালীপুজোর দিনে মানত পূরণ হওয়া অগণিত ভক্ত মন্দিরে সোনা ও রুপোর অলঙ্কার, শাড়ি এবং বিশেষ ভোগ নিবেদন করতে আসেন। বহু দূর-দূরান্ত থেকেও পুণ্যার্থীরা ছুটে আসেন জাগ্রত এই দেবীর দর্শনে। অমাবস্যার রাতে মায়ের বিশেষ নিশি পুজো এবং অলৌকিক মহা আরতি দেখার জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে তিল ধারণের জায়গা থাকে না।
উৎসবের মরশুমে নতুন রূপ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
সাড়ম্বরে পুজো আয়োজনের জন্য বালুরঘাটের তহবাজারের ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় মন্দির কমিটি মাসখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান মেনে সম্পূর্ণ বৈদিক ও তন্ত্র মতে মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে আশপাশের আধুনিক শহর ও জীবনযাত্রা, কিন্তু বুড়ামা কালীর আরাধনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ৫০০ বছর ধরে চলে আসা এই পুজো আজ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অন্যতম প্রধান আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।