জঙ্গলে রয়্যাল বেঙ্গলের আতঙ্কে বটতলায় প্রদীপ! সাড়ে ৪ শতক পেরিয়ে কীভাবে তৈরি হলো সাগরদ্বীপের ঐতিহাসিক আদিকালী মন্দির?

আজ যেখানে জমজমাট জনবসতি, চওড়া রাস্তাঘাট আর মানুষের দিনরাত কোলাহল, চারশো বছর আগে সেখানে শুধুই বিরাজ করত সুন্দরবনের ঘন ভয়াল অরণ্য। দিনের আলোতেও সেই জঙ্গলে পা রাখতে বুক কাঁপত সাধারণ মানুষের। ছায়াময় গাছের আড়ালে আড়ালে ওত পেতে থাকত ক্ষুধার্ত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

জীবিকার তাগিদে সাগরদ্বীপের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে যেসব কাঠুরে ও মৌয়ালে কাঠ এবং মধু সংগ্রহ করতে যেতেন, তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটত চরম মৃত্যুভয়ের মধ্যে। অরণ্যের সেই রুদ্ররূপের মুখে নিরূপায় হয়ে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে এক নির্জন বটগাছের তলায় শুরু হয়েছিল মা কালীর আরাধনা। প্রদীপের আলো জ্বালিয়ে অরণ্যচারী মানুষের সেই বিশ্বাসের সূত্রপাত। সময়ের স্রোতে বদলেছে দ্বীপের ভূপ্রকৃতি, কেটে গিয়েছে জঙ্গল, গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু কমেনি বিশ্বাস। সেই বটতলার পুজোই আজ বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা সাগরদ্বীপের অতি ঐতিহ্যবাহী ধসপাড়া আদিকালী মন্দির। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের প্রাচীন এই তীর্থক্ষেত্র এবার কালীপুজোর আগে নতুন করে সেজে উঠছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল মা কালীর এই আরাধনা?

স্থানীয় জনশ্রুতি ও মন্দির কর্তৃপক্ষের ঐতিহ্যবাহী দাবি অনুযায়ী, সাগরদ্বীপে মানুষের প্রথম জনবসতি গড়ে ওঠার সময় থেকেই এই মন্দিরে মা কালীর আরাধনা চলে আসছে। নির্দিষ্ট লিখিত ঐতিহাসিক নথি না থাকলেও বংশপরম্পরায় চলে আসা পুজোর ধারা ও প্রবীণদের মুখের কাহিনি এই সাড়ে চারশো বছরের ইতিহাসকেই তুলে ধরে।

কথিত আছে, যখন সুন্দরবনের এই দ্বীপে বাঘের আক্রমণে একের পর এক কাঠুরে ও মধু সংগ্রাহকের প্রাণ যেত, তখন প্রকৃতির শক্তির কাছে নিজেদের সঁপে দিয়ে একটি সুবিশাল বটগাছের নিচে মা কালীর পুজো শুরু করেন তাঁরা। মানুষের বিশ্বাস ছিল, দেবী কালীর কৃপা থাকলে বনের কোনো পশুই তাঁদের স্পর্শ করতে পারবে না। ধীরে ধীরে সেই বটতলাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় বিশ্বাসের পরিধি। একদা একটি গাছের নিচে শুরু হওয়া পুজো কীভাবে শতকের পর শতক ধরে প্রদীপের আলোয় মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠল, ধসপাড়া আদিকালী মন্দির আজও তার ঐতিহাসিক সাক্ষী।

একটি মন্দিরে ৫টি বড় মূর্তি, সঙ্গে অজস্র মানতের কালী!

ধসপাড়া আদিকালী মন্দিরের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ও আকর্ষণ হলো এখানকার প্রতিমা বিন্যাস। সাধারণ মন্দিরে একটি মাত্র মূল বিগ্রহ থাকলেও, এই মন্দিরে একই সঙ্গে পূজিত হন পাঁচটি বড় কালীমূর্তি।

এর পাশাপাশি মন্দির চত্বরজুড়ে রয়েছে আরও অসংখ্য ছোট-বড় কালীপ্রতিমা। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী মানত পূরণ হলেই তাঁরা মন্দিরে নতুন প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে যান। ফলে একের পর এক মূর্তি জমে অনন্য রূপ নিয়েছে মন্দির প্রাঙ্গণ। পুরোহিতের মতে, প্রতিটি মূর্তির পেছনেই লুকিয়ে রয়েছে অলৌকিক কোনো অভিজ্ঞতা বা আস্থার ইতিহাস। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার এখানে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়, যেখানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু পুণ্যার্থী ছুটে আসেন।

বদলেছে বলির নিয়ম, তবে অটুট অদম্য বিশ্বাস

কালের নিয়মে ধসপাড়া আদিকালী মন্দিরের পুজোর পরিকাঠামো ও নিয়মে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। অতীতে এখানে পুরোহিত ছাড়াই ভক্তরা স্বহস্তে পুজো দিতেন এবং প্রথা অনুযায়ী চলত পশুবলি। কিন্তু বর্তমানে পশুবলির প্রথা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও বৈষ্ণব মতে মা কালীর আরাধনা করা হয়।

মন্দিরের প্রধান সেবায়েত প্রকাশ পণ্ডা জানান, “সাগরদ্বীপের উৎপত্তিকাল থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা মায়ের সেবা করে আসছেন। মা অত্যন্ত জাগ্রত ও করুণাময়ী, ভক্তদের সব মনস্কামনা পূরণ করেন।” মন্দির কমিটির সদস্য উৎপল প্রামাণিকের কথায়, এটি শুধু কোনো ধর্মীয় স্থান নয়, স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখের চিরন্তন আস্থার ঠিকানা।

কালীপুজোর আগে মেগা প্রস্তুতি

কার্তিক মাসের অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই ধসপাড়া আদিকালী মন্দিরে জনসমুদ্র তৈরি হয়। এবারও কালীপুজোর আগে মন্দির চত্বর সংস্কার এবং চোখধাঁধানো আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। ইতিহাস, সুন্দরবনের জীবনসংগ্রাম এবং অদম্য ভক্তির মেলবন্ধনে তৈরি সাগরদ্বীপের এই বটতলার পুজো আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—কালের নিয়মে ভূগোল বদলালেও গভীর বিশ্বাস চিরকাল অমলিন থেকে যায়।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *