এক ধাক্কায় ন্যূনতম ভাড়া ২০ টাকা? ৮ বছর পর বাসভাড়া বাড়ানোর জোর দাবি, মাথায় হাত নিত্যযাত্রীদের!

দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কার্যত একই জায়গায় থমকে রয়েছে সরকারিভাবে নির্ধারিত বেসরকারি বাস ও মিনিবাসের ভাড়া। অথচ এই সময়ের মধ্যে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে ডিজেলের দাম, টায়ার, যন্ত্রাংশ, বিমা এবং কর্মচারীদের বেতন। তীব্র আর্থিক সংকটে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি পরিবহণ শিল্পকে বাঁচাতে এবার রাজ্যজুড়ে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি নতুন করে অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে। কলকাতা ও তৎসংলগ্ন মহানগরে ন্যূনতম ভাড়া ১৮ টাকা এবং জেলায় ন্যূনতম ভাড়া ২০ টাকা করার মেগা প্রস্তাব পেশ করেছে জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেট।
কর্ণাটকে বাড়ল ভাড়া, আঁচ পড়ল বাংলায়!
সম্প্রতি কর্ণাটক সরকার তাদের ৪টি প্রধান সরকারি পরিবহণ সংস্থার বাসে এক ধাক্কায় অনেকটাই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। বেঙ্গালুরুতে লোকাল বাসের ন্যূনতম ভাড়া ৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ৩৫ টাকার জায়গায় ৪৫ টাকা করা হয়েছে। বিমানবন্দরের বাসের ভাড়াও বেড়ে হয়েছে ৪২৫ টাকা। কর্ণাটকের এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে থমকে থাকা বাসভাড়া বৃদ্ধির দাবি নতুন করে ঘি ঢেলেছে আলোচনার আগুনে।
২০১৮ থেকে ২০২৬: কত বেড়েছে খরচের বহর?
জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটের সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পষ্ট কথা, শেষবার ২০১৮ সালে বাসের ভাড়া মাত্র ১ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তারপর কোভিডের ধাক্কা এবং আনুষঙ্গিক খরচের পাহাড় জমেছে। যদি প্রতি বছর ন্যূনতম ১ টাকা করেও ভাড়া বাড়ানো হত, তবে আজ স্বাভাবিক নিয়মেই ন্যূনতম ভাড়া ১৬-১৮ টাকা হত। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ চালক, কন্ডাক্টর ও মেকানিকদের বাঁচাতেই ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা খোলা নেই।
কোন রুটে কত ভাড়ার প্রস্তাব?
পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কাছে পাঠানো চিঠিতে দূরত্ব অনুযায়ী নতুন যে ভাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
-
০ থেকে ৪ কিমি: ১৮ টাকা
-
৪ থেকে ৮ কিমি: ২০ থেকে ২২ টাকা
-
৮ থেকে ১২ কিমি: ২৪ টাকা
-
১৬ থেকে ২২ কিমি: ২৮ থেকে ৩০ টাকা
-
জেলার সাধারণ বাস: প্রথম ৪ কিমিতে ২০ টাকা, তারপর প্রতি অতিরিক্ত কিমিতে ১.২০ টাকা।
-
জেলার এক্সপ্রেস বাস: প্রথম ৪ কিমিতে ২৫ টাকা।
-
এসি ও ভলভো বাস: এসি বাসে প্রথম ৪ কিমিতে ৪০ টাকা এবং ভলভো বাসে প্রথম ২ কিমিতে ৫০ টাকা করার প্রস্তাব।
মালিক সংগঠনগুলোর মধ্যেই মতবিরোধ!
তবে ভাড়ার এই প্রস্তাব সামনে আসতেই নিত্যযাত্রীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কোভিডের পর থেকেই এমনিতেই নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে অনেক রুটে, তার ওপর এক ধাক্কায় ন্যূনতম ১৮-২০ টাকা ভাড়া হলে সাধারণ মানুষের পকেটে চরম টান পড়বে।
অন্যদিকে, সমস্ত বাস মালিক সংগঠন আবার জয়েন্ট কাউন্সিলের প্রস্তাবিত এই অঙ্কের সঙ্গে একমত নয়। অল বেঙ্গল বাস-মিনিবাস সমন্বয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায় এবং আসানসোল মিনিবাস অ্যাসোসিয়েশনের সুদীপ কুমার রায়ের মতে, কোনো একটি সংগঠন নিজেদের মতো ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করে দিলে যাত্রীদের মনে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়। উত্তরবঙ্গ বাস ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক প্রণবকান্তি মানিও জানিয়েছেন, দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের যাত্রীসংখ্যা এবং রূপরেখা এক নয়। ফলে হঠাৎ করে ভাড়ার অঙ্ক চাপিয়ে না দিয়ে সরকারের উচিত সমস্ত খরচের অডিট রিপোর্ট খতিয়ে দেখে একটি গ্রহণযোগ্য মাঝারি পথ তৈরি করা।
সরকারের সামনে উভমুখী সংকট
বর্তমানে রাজ্য সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে দীর্ঘদিন ভাড়া না বাড়ায় লাটে ওঠার জোগাড় বেসরকারি বাস মালিকদের ব্যবসা, অন্যদিকে এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ভাড়ার বোঝা না চাপানো। সরকারি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত ঠিক কত টাকা ভাড়ার অনুমোদন দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।