একটি ট্রেন লেট করায় জন্ম নিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের এই বিখ্যাত স্ন্যাক্স! জানুন ‘মদ্দুর বড়া’র ১০০ বছরের রুদ্ধশ্বাস ইতিহাস

যাঁরা বেঙ্গালুরু ও মহীশূরের (Bengaluru and Mysore) মধ্যে ট্রেনে যাতায়াত করেন, তাঁদের কাছে ‘মদ্দুর বড়া’ (Maddur Vada) স্রেফ কোনো সাধারণ নাস্তা বা স্ন্যাক্স নয়— এটি এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া ও অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতার নাম। আজও ট্রেনের কামড়ায় হকারদের মুখে “মদ্দুর বড়া… মদ্দুর বড়া” হাঁক শুনলেই যাত্রীরা তা কেনার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, কর্নাটকের এই পরম প্রিয় বিখ্যাত খাবারটি প্রথমবার কোনো বড় ফাইভ-স্টার হোটেলের রান্নাঘরে তৈরি হয়নি? বরং প্রায় শতবর্ষ আগে মান্ডিয়ার (Mandya) মদ্দুর রেলওয়ে স্টেশনের এক ছোট্ট সাধারণ টিফিন রুমে হুট করে এর জন্ম হয়েছিল!

১৯১৭ সালের এক তাড়াহুড়ো ও ঐতিহাসিক আবিষ্কার!
ঘটনাটি ১৯১৭ সালের। মান্ডিয়া জেলার মদ্দুর রেলওয়ে স্টেশনে ‘ভেজিটেরিয়ান টিফিন রুম’ (Vegetarian Tiffin Room) নামে একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালাতেন রামচন্দ্র বুধিয়া নামের এক ব্যক্তি। বেঙ্গালুরু ও মহীশূরের মধ্যে যাতায়াতকারী ট্রেনগুলির যাত্রীদের জন্য তিনি ইডলি, সাধারণ বড়া ও পকোড়ার মতো নানা ধরনের নাস্তা বিক্রি করতেন।

একদিন আচমকাই তিনি খবর পান, মহীশূরগামী একটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই স্টেশনে ঢুকে পড়ছে! অথচ যাত্রীদের পরিবেশন করার জন্য যে পকোড়া তৈরি হচ্ছিল, তা তখনও আধাকাঁচা। ট্রেন এসে থামলে নাস্তা বেচতে না পারলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

এই চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রামচন্দ্র বুধিয়া রান্নাঘরে থাকা সমস্ত উপকরণ একসাথে মিশিয়ে ঝটপট এক নতুন খাবার বানিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মিশ্রণটি দিয়ে গোল পকোড়া না বানিয়ে হাতের তালুতে চ্যাপ্টা করে গরম তেলে ভেজে তুলে নেন। ট্রেন থামতেই ক্ষুধার্ত যাত্রীদের হাতে গরম গরম সেই খাবার তুলে দেওয়া হয়। আর প্রথম কামড়েই যাত্রীরা যেন স্বর্গের স্বাদ পান! তাড়াহুড়োয় তৈরি সেই অভাবনীয় নাস্তাই পরবর্তীতে চিরকালের জন্য ‘মদ্দুর বড়া’ নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে যায়।

কীভাবে তৈরি হয় এই বিশেষ বড়া?
অন্যান্য সাধারণ দক্ষিণ ভারতীয় ‘মেদু বড়া’ (Medu Vada) বা ‘মসালা বড়া’র সাথে মদ্দুর বড়ার বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কারণ এটি তৈরিতে বিউলির ডাল বা ছোলার ডাল মুখ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।

তৈরির সিক্রেট রেসিপি:

এতে প্রধান উপাদান হিসেবে থাকে চালের গুঁড়ো, ময়দা এবং সুজি।

এর সাথে মেশানো হয় মিহি করে কাটা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, কারিপাতা, ধনেপাতা, কোড়া নারকেল, কাজুবাদাম বা চিনাবাদাম, সামান্য হিঙ এবং লবণ।

এরপর সমস্ত উপাদান দিয়ে ছোট ছোট লেচি কেটে চ্যাপ্টা গোল আকৃতি দিয়ে ডুবো গরম তেলে লালচে করে ভাজা হয়।

এই বড়া বাইরে থেকে অত্যন্ত মুচমুচে এবং ভেতরে তুলনামূলকভাবে নরম হয়। গরম গরম নারকেলের চাটনি এবং এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বা চায়ের সাথে এর স্বাদ এক কথায় অতুলনীয়।

রাজপ্রাসাদ থেকে হাইওয়ে: ছড়িয়ে পড়ল মদ্দুর বড়ার জাদু
রামচন্দ্র বুধিয়ার হাত ধরে শুরু হওয়া এই মদ্দুর বড়ার চাহিদা দিন দিন আকাশছোঁয়া হতে শুরু করে। তাঁর পরিবার ১৯৪৭-৪৮ সাল পর্যন্ত এটি নিষ্ঠার সাথে বানিয়ে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে এইচডি হেব্বারের পরিবার এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের ব্যাটন নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং এর অনন্য স্বাদ অক্ষুণ্ণ রেখে জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তোলেন। যদিও শতবর্ষ পার করে ২০১৭ সালে ঐতিহাসিক সেই ‘ভেজিটেরিয়ান টিফিন রুম’টি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

মদ্দুর বড়ার প্রেমে মজেছিল এমনকি মহীশূরের রাজ পরিবারও! কথিত আছে, রাজপ্রাসাদে বিশেষ অতিথি এলে রুপোর থালায় সাজিয়ে মদ্দুর স্টেশন থেকে এই বড়া রাজমহলে নিয়ে যাওয়া হতো।

কালের নিয়মে মদ্দুর বড়া আজ কেবল রেলওয়ে স্টেশনের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কর্নাটকের হাইওয়ের ধারের ক্যাফে, ছোট-বড় রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই অসাধারণ ঐতিহ্যবাহী স্ন্যাক্সটি নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করে নিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *