গলা বসে যাচ্ছে আইনজীবীদেরও! ‘আশা করি আবহাওয়া উপভোগ করছেন’— সুপ্রিম কোর্টের খোঁচার পর তোলপাড় এনসিআর

জাতীয় রাজধানী অঞ্চল তথা দিল্লি-এনসিআর-এর (NCR) দমবন্ধ করা বায়ুদূষণ সংকট নিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলির ঢিলেঢালা মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ফসলের অবশিষ্টাংশ বা খড় সংগ্রহের নির্দিষ্ট মূল্য আগেভাগেই ঘোষণা করতে হবে এবং এই পুরো ব্যবস্থার দায়িত্ব ও পরিকাঠামো সরাসরি গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির হাতে ন্যস্ত করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার গঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চের সামনে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। শুনানির সূচনাতেই প্রধান বিচারপতি উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে কিছুটা হালকা চালে মন্তব্য করে বলেন, “আশা করি আপনারা সবাই দিল্লির এই আবহাওয়া উপভোগ করছেন!” তবে আদালতের সেই হালকা মেজাজ মেলাতে বেশি সময় লাগেনি। সুপ্রিম কোর্টের নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী অপরাজিতা সিং অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান, দিল্লির বায়ুদূষণ এখনও ‘মারাত্মক’ (Severe) পর্যায়ে আটকে রয়েছে। দূষণের ভয়াবহতায় তাঁর নিজের গলাও বসে গিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমানে দিল্লির বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অর্থ হলো প্রতিদিন একজন মানুষের গড়ে প্রায় ৩০টি করে সিগারেট খাওয়া!”

খড় পোড়ানো বনাম ধনী শ্রেণির বিলাসবহুল গাড়ি
শুনানি চলাকালীন বায়ুদূষণের মূল উৎস নিয়ে চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। বিচারপতির বেঞ্চ প্রশ্ন করে, এই বিষাক্ত বাতাসের জন্য কি কেবল কৃষকদের খড় পোড়ানোই দায়ী, নাকি সমাজের ধনী শ্রেণি ও তাঁদের রাস্তায় বের হওয়া হাজার হাজার ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়িও সমানভাবে দায়ী?

আদালত মন্তব্য করে, “আমরা বারবার কেবল খড় পোড়ানোর কথাই বলে আসছি… কৃষকদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশও দেওয়া হয়েছে (যদিও অনেকে হয়তো তা ব্যবহারে দ্বিধাবোধ করছেন)। কিন্তু সমাজের অভিজাত ও ধনী শ্রেণির মানুষের দায়বদ্ধতা কোথায়? রাস্তায় তো প্রতিদিন হাজার হাজার বিলাসবহুল গাড়ি চলাচল করছে…”

এর উত্তরে অ্যামিকাস কিউরি অপরাজিতা সিং আদালতকে জানান, দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস হলো সরাসরি যান চলাচল। অন্যদিকে, খড় পোড়ানো দিল্লির মোট দূষণের প্রায় ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী। তিনি সতর্ক করে বলেন, দিল্লি ইতিমধ্যেই এক চরম স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে খড় পোড়ানোর পাশাপাশি আবর্জনা পোড়ানোর মতো স্থানীয় স্তরের বেআইনি কর্মকাণ্ড রুখতেও কালবিলম্ব না করে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজার নির্দেশ
এর আগে সাময়িক বৃষ্টির ফলে দিল্লির বাতাসের গুণমান কিছুটা উন্নত হয়েছিল বলে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট আশা প্রকাশ করে যে, কৃষকরা যেহেতু পরবর্তী চাষের মরসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাই এই মুহূর্তে হয়তো খড় পোড়ানোর প্রবণতা কিছুটা কমেছে। তবে আগামী বছরগুলিতে এই পুনরাবৃত্তি এড়াতে এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে খড় কেনার সঠিক দাম নির্ধারণ করা এবং পঞ্চায়েত স্তরে পরিকাঠামো মজবুত করার ওপরেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *