গ্রেফতারির পরেই ২৪ ঘণ্টার হিসাব শুরু! পুলিশি হেফাজতে কড়াকড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ঘুম উড়ল প্রশাসনের

কাউকে হেফাজতে নেওয়ার পর থেকেই ২৪ ঘণ্টা সময় শুরু হবে—আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার দেখানোর নামে কালক্ষেপ করার দিন এবার শেষ। কাউকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতেই হবে। যদি এই সময়ের মধ্যে আদালতে পেশ করা না হয়, তবে অভিযুক্তকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষ আদালত (Supreme Court) এই কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে। পুলিশি হেফাজতে আটকে রাখার নামে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে আইনি মহল।
গ্রেফতারি বনাম আটক: কৃত্রিম তফাত বরদাস্ত নয়
বৃহস্পতিবার বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া ও বিচারপতি অতুল এস চান্দুরকারের বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে ‘গ্রেফতার’ এবং ‘আটক’ নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া রয়েছে। এই দুয়ের মধ্যে কোনো কৃত্রিম বা ভুয়া পার্থক্য তৈরি করার অবকাশ নেই। আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি নথিবদ্ধ করার আগে তল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদের নামে দিনের পর দিন আটকে রেখে সেই সময়কে ২৪ ঘণ্টার হিসাবের বাইরে রাখার ফিকির কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না শীর্ষ আদালত। কারণ এই ধরনের ব্যাখ্যা সরাসরি সংবিধানের পরিপন্থী।
এনডিপিএস (NDPS) আইনের একটি মামলার শুনানিতে এই প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে সামনে আসে। ত্রিপুরার ওই মামলাটিতে দেখা যায়, পুলিশ নির্দিষ্ট সময় অভিযুক্তদের হেফাজতে নিলেও তাদের আনুষ্ঠানিক গ্রেফতার দেখানোর মধ্যে দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার ব্যবধান রাখা হয়েছিল। অথচ এর পক্ষে তদন্তকারী সংস্থা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এই প্রসঙ্গেই ক্ষোভ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদারকি ছাড়াই ১৮ ঘণ্টা হেফাজতে থাকা একটি দীর্ঘ সময় এবং এর মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার বা পুলিশি নির্যাতনের স্পষ্ট আশঙ্কা থেকে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশিকা ও নতুন নিয়ম
আদালতের রায়ে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
-
সময় গণনা: কাউকে কার্যত স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা শুরু হবে। এর মধ্যে কেবল গ্রেফতারির স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যুক্তিসঙ্গত যাতায়াতের সময়টুকুই বাদ দেওয়া যেতে পারে। এর বাইরে অনুসন্ধান বা তল্লাশির অজুহাতে কোনো বাড়তি সময় ছাড় দেওয়া হবে না।
-
ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব: আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ধৃত ব্যক্তিকে যখনই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হবে, তখন থেকে তিনি ঠিক কবে এবং কখন থেকে স্বাধীনতা হারিয়েছেন, তার প্রকৃত তারিখ ও সময় নথিবদ্ধ করতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটকেই। সাংবিধানিক সময়সীমা সঠিকভাবে মানা হয়েছে কি না, তা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করার দায়িত্বও বিচারকদের।
-
পূর্ববর্তী রায় খারিজ: ওড়িশা হাইকোর্ট, মাদ্রাজ হাইকোর্ট এবং কেরল হাইকোর্টের কিছু পূর্ববর্তী মামলার রায়ে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারির আগের সময়কালকে ২৪ ঘণ্টার হিসেবের বাইরে রাখার যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট আজ সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে তা খারিজ করে দিয়েছে।
পুলিশি তদন্তের নামে জিজ্ঞাসাবাদের দীর্ঘসূত্রিতা এবং গ্রেফতার দেখানোর ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব প্রায়শই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটায় বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের। ফলে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া রায়ের পর এবার থেকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হবে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।