মেসির রাজকীয় ফেয়ারওয়েল বনাম রোনাল্ডোর বিতর্কে মোড়া পতন—ফুটবল বিশ্বের দুই মেরুর করুণ চিত্র

ফুটবলের প্রায় দেড় শতাব্দীর ইতিহাসে এমন দ্বৈরথ পৃথিবী আগে কখনও দেখেনি। টানা দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন দুই মহাতারকা—একজন বাঁ পায়ের জাদুতে বিশ্বকে মোহিত করা লিওনেল মেসি, অন্যজন পেশিবহুল আগ্রাসন আর নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ইতিহাস গড়া ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কিন্তু ২০২৬ সাল এসে সেই ঐতিহাসিক রেষারষির চূড়ান্ত ইতি টেনে দিল। চলতি বছরের ৩১ অগাস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন মেসি, আর ঠিক তার কয়েক মাসের মাথায় ৫ নভেম্বর বুট জোড়া তুলে রাখার ঘোষণা করলেন রোনাল্দো। বিশ্ব ফুটবলের দুই সম্রাটের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সূর্যাস্ত ঘটল একই বছরে, তবে সেই বিদায়ের আবহে লেখা রইল আকাশ-পাতাল বৈপরীত্যের করুণ দুই রূপ।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের রেকর্ডের পাতায় তাকালে পরিসংখ্যানে মেসিকে বেশ কিছুটা পেছনে রেখেই মাঠ ছাড়ছেন রোনাল্দো। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে রেকর্ড ১৪৬টি গোল রয়েছে সিআর সেভেনের নামের পাশে। বিপরীতে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬টি গোল করেছেন মেসি। কিন্তু পরিসংখ্যামের বিচারে এগিয়ে থাকলেও, বিদায়ের মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে একজন কিংবদন্তির যে সম্মান ও ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিল, পর্তুগিজ অধিনায়কের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত তা জুটল না।

গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে নরওয়ের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রোনাল্দোকে প্রথম একাদশে রাখেননি পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুস। স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে মাঝপথেই দলের শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যান সিআর সেভেন। কোচ জেসুস এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং পরবর্তীতে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তির খাঁড়াও নেমে আসে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ভুল স্বীকার করে শাস্তি মেনে নেওয়ার বার্তা দিলেও, সাসপেনশন চলাকালীনই মাত্র ৫ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতীয় দলের ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন রোনাল্দো। কোনও রাজকীয় ফেয়ারওয়েল নয়, সতীর্থদের উষ্ণ আলিঙ্গন বা মাঠভর্তি দর্শকের তুমুল করতালির বদলে—বিতর্ক, অসন্তোষ আর ড্রেসিংরুমের গৃহযুদ্ধের মাঝেই নিভৃতে বিদায় নিতে হলো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে।

মেসির জাঁকজমকপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বিদায়পর্ব

এর সম্পূর্ণ উল্টো ছবি দেখা গেছে লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে। কোপা আমেরিকা জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের প্রস্থানকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ করে তুলেছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) ঘরের মাঠে ঘরের ছেলের জন্য এক অবিস্মরণীয় ফেয়ারওয়েল ম্যাচের আয়োজন করেছিল। কোচ লিওনেল স্কালোনি থেকে শুরু করে সতীর্থরা চোখের জলে বিদায় জানান তাঁদের চিরকালের নায়ককে।

২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে একসঙ্গে পথ চলা স্কালোনি-মেসি জুটি যেখানে ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জিতে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেখানে ঠিক বিপরীত ছবি ধরা পড়ল পর্তুগাল শিবিরে। রোনাল্দো ও কোচ জেসুসের ইগোর সংঘাত বিশ্ব ফুটবলের এই দুই কিংবদন্তির বিদায়লগ্নে এনে দাঁড় করাল সম্পূর্ণ বিপরীত দুই মেরুতে।

একটি ডায়েরির পাতা বনাম একটি ৫ মিনিটের ক্ষোভের ভিডিও—আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে দুই অবিসংবাদিত সম্রাটের বিদায়পর্ব সম্পন্ন হলো বটে, কিন্তু ড্রেসিংরুমের রাজনীতি আর মহাতারকাদের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে ফুটবল প্রেমীদের মনে প্রশ্ন রয়ে গেল সুদূর প্রসারী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *