‘বাবার থেকে দামি কিছু হয় না!’ নিজের লিভারের অংশ কেটে মেয়েকে বাঁচালেন গর্বিত পিতা

বাবার কাছে তাঁর মেয়েই সব—এই প্রবাদটিকেই বাস্তবে আবার সত্য প্রমাণ করলেন এক কর্তব্যপরায়ণ পুলিশকর্মী। বিরল এক জিনগত লিভারের রোগে আক্রান্ত ৮ বছরের মেয়েকে বাঁচাতে নিজের শরীরের লিভারের একটি অংশ দান করলেন তিনি। কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এই জটিল লিভার প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার। বর্তমানে সুস্থ হয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছে ছোট্ট মেয়েটি, আর সুস্থ হয়ে নিজের স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে গেছেন তাঁর মহৎপ্রাণ বাবাও।
দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ছিল রোগের রহস্য
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত জটিল ও বিরল এক জিনগত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল শিশুটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে আনুমানিক মাত্র একজন এই রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে জন্ডিস, পেট ফুলে যাওয়া, অসহ্য চুলকানি, বমি, খিদে কমে যাওয়া এবং শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যাওয়ার মতো একাধিক উপসর্গে ভুগছিল সে। বারবার হাসপাতালেও দৌড়াতে হয়েছে পরিবারকে, পেট থেকে জল পর্যন্ত বের করতে হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই মেয়ের আসল রোগ ধরতে পারছিল না কেউ।
অবশেষে ওই নামী হাসপাতালে নিয়ে আসার পর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, শিশুটি প্রোগ্রেসিভ ফ্যামিলিয়াল ইনট্রাহেপাটিক কোলেস্টেসিস টাইপ ৩ (PFIC 3) নামক একটি বিরল জিনগত লিভারের রোগে আক্রান্ত। এই রোগে লিভারের ভেতরে পিত্ত জমে ধীরে ধীরে লিভারকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন শিশুটির বিলিরুবিনের মাত্রা বিপদসীমা পেরিয়ে ২০ mg/dl-এ পৌঁছে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এই রোগ থেকে বাঁচানোর একমাত্র স্থায়ী পথ হলো লিভার প্রতিস্থাপন।
এক মুহূর্তও ভাবেননি বাবা! ১৪ ঘণ্টার ম্যারাথন অস্ত্রোপচার
চিকিৎসকদের মুখে লিভার বদলের কথা শোনার পর এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিতীয়বার ভাবেননি ৪২ বছর বয়সি ওই পুলিশকর্মী বাবা। সমস্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তিনি লিভার দানের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত প্রমাণিত হন। এরপর নিজের লিভারের বাঁ দিক থেকে ৪১০ গ্রাম ওজনের একটি অংশ মেয়েকে দান করেন তিনি।
শিশুটির এই জটিল লিভার প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার একটানা প্রায় ১৪ ঘণ্টা ধরে চলে। ট্রান্সপ্লান্ট সার্জেন, হেপাটোলজিস্ট, শিশু চিকিৎসক এবং অ্যানাস্থেটিস্টদের নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ দল এই কঠিন অপারেশনে অংশ নেন।
হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ ডা. রাহুল রায় জানান, শিশুদের রক্তনালী এবং পিত্তনালী অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ছোট হওয়ায় এই ধরনের অস্ত্রোপচারে সামান্য ভুলেরও কোনো অবকাশ থাকে না। অন্যদিকে, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট অ্যানাস্থেশিওলজির কনসালট্যান্ট ডা. অনুপম পুরকায়স্থের মতে, অসুস্থ শিশুটির পাশাপাশি দাতা বাবার শারীরিক সুরক্ষাও ছিল সমানভাবে চ্যালেঞ্জিং।
মাত্র ১৮ দিনেই হাসপাতাল থেকে জয়ী হয়ে বাড়ি ফেরা
অস্ত্রোপচারের মাত্র একদিনের মাথায় ভেন্টিলেটরের সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে শুরু করে ছোট্ট মেয়েটি। এরপর লিভার আইসিইউ-তে কড়া পর্যবেক্ষণে রেখে তার শরীরে প্রয়োজনীয় ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ শুরু করা হয়, যাতে নতুন লিভার কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই মানিয়ে নিতে পারে।
অক্লান্ত পরিশ্রম ও চিকিৎসকদের সুচিকিৎসায় মাত্র ১৮ দিনের মাথায় সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছুটি পায় সে। অন্যদিকে, সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া বাবা মাত্র ১০ দিনেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বর্তমানে নিজের পুলিশি ডিউটিতে ফিরে গেছেন। মেয়ের শরীরে নিজের জীবনের একটা অংশ টিকিয়ে রাখতে পারার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না এই সাহসী বাবার কাছে!