পৃথিবীর দ্বিতীয় চাঁদ আবিষ্কার হল, রহস্যময় ‘মিনি-মুন’ দেখে অবাক বিজ্ঞানীরা

ছোটবেলা থেকেই আমরা জেন এসেছি পৃথিবীর একটাই চাঁদ রয়েছে। কিন্তু এবার বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এল এক চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর খবর। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর কক্ষপথে হাজির হয়েছে এক নতুন অতিথি! মহাকাশ থেকে ছুটে আসা একটি ক্ষুদ্র গ্রহাণু আপাতত পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে আমাদের গ্রহের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে। ‘২০২৬ QQ8’ নামের এই মহাজাগতিক বস্তুটিকে পৃথিবীর একটি অস্থায়ী উপগ্রহ বা ‘মিনি-মুন’ (Mini-Moon) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পৃথিবীর সঙ্গেই এই মহাজাগতিক পাথরখণ্ডটি থাকবে। এরপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান কাটিয়ে ফের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার চিরচেনা পথে পাড়ি দেবে এটি।
কীভাবে আবিষ্কৃত হলো এই মিনি-মুন?
মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ অগাস্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিসটিন শ্রনেস্কি এই মহাজাগতিক বস্তুটি আবিষ্কার করেন। তবে এর কক্ষপথ সংক্রান্ত গভীর পর্যবেক্ষণ বলছে, এটি আরও অনেক আগেই, অর্থাৎ এপ্রিল মাসের শেষের দিকেই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করেছিল।
প্রথমদিকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল—এই ‘২০২৬ QQ8’ আদৌ কোনো প্রাকৃতিক গ্রহাণু, নাকি মানুষের তৈরি মহাকাশের কোনো বর্জ্য বা পুরনো রকেটের অংশ? তবে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২.২ মিটার টেলিস্কোপ এবং লওয়েল ডিসকভারি টেলিস্কোপ দিয়ে একটানা পর্যবেক্ষণের পর সেই রহস্যের সমাধান হয়। মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার নিশ্চিত করে জানায় যে, এটি কোনো কৃত্রিম বর্জ্য নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি ছোট গ্রহাণু।
পৃথিবীর টানে কীভাবে ধরা পড়ল এই পাথরখণ্ড?
মহাকাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো ছোট গ্রহাণু যখন পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন মাঝেমধ্যেই আমাদের গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাকে সাময়িকভাবে নিজের দিকে টেনে নেয়। ২০২৬ QQ8-এর ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। গত এপ্রিল মাসে এই মহাজাগতিক পাথরখণ্ডটি পৃথিবীর ‘হিল স্ফিয়ার’-এ প্রবেশ করে। গ্রহের এই বিশেষ অঞ্চলেই তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সূর্যের আকর্ষণের চেয়ে ছোট বস্তুগুলির গতিপথের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
তবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় এই গ্রহাণুটি কোনো নিখুঁত বৃত্তাকার পথে ঘুরছে না, বরং এক অদ্ভুত লুপের মতো আঁকাবাঁকা পথে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই পৃথিবীর টান কাটিয়ে এটি ফের স্বাধীনভাবে সৌরজগতে নিজের যাত্রা শুরু করবে।
পৃথিবীর সঙ্গে এই গ্রহাণুর পুরোনো পরিচয়
মজার বিষয় হলো, ‘২০২৬ QQ8’ কিন্তু আমাদের গ্রহের কাছে একেবারে অপরিচিত নয়। কক্ষপথের হিসাব বলছে, প্রায় প্রতি ১০ বছর অন্তর পৃথিবীর কাছাকাছি আসে এই গ্রহাণুটি। এর আগে ১৯৬৫ সালেও এটি পৃথিবীর পাশ দিয়ে গিয়েছিল, তবে সেবার মাধ্যাকর্ষণের টানে আটকে পড়ার মতো কাছাকাছি আসেনি। পরবর্তী সময়ে ২০৫৮ সালে ফের এর পৃথিবীর কাছ দিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগেও ২০২০ SO, ২০২০ CD3 এবং ২০২৪ PT5-এর মতো বেশ কিছু মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর অস্থায়ী অতিথি হয়ে এসেছে। তাছাড়া পৃথিবীর কিছু ‘কোয়াসি-মুন’ বা প্রায়-চাঁদও (যেমন ২০২৫ PN7) রয়েছে, যেগুলি দূর থেকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সঙ্গেই ঘুরছে, তবে বাস্তবে সেগুলি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। আপাতত ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত মহাকাশে পৃথিবীর নতুন এই অস্থায়ী সঙ্গীটির গতিপ্রকৃতির ওপর নজর রেখে চলেছেন বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।