. “অনির্দিষ্টকাল ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে না!” যন্তর মন্তরে ছাত্র পেটানো মামলায় পুলিশকে সুপ্রিম কোর্টের চরম হুঁশিয়ারি

দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের অমানবিক নির্যাতন এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মারাত্মক অভিযোগের মামলায় এক অভূতপূর্ব ও কড়া অবস্থান নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্যানেলকে আগামী এক মাসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতেই হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ার নাম করে অনির্দিষ্টকাল সময় নষ্ট করা যাবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিচারপতিরা।

“স্ট্যাটাস রিপোর্ট যথেষ্ট নয়!” সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চে বৃহস্পতিবার এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি হয়। শুনানির সময় বেঞ্চ ক্ষোভ প্রকাশ করে উল্লেখ করে যে, গত ৩১ অক্টোবর তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদনটি পেশ করা হয়েছিল, তা কাজের অগ্রগতি সংক্রান্ত কেবল একটি ‘স্ট্যাটাস রিপোর্ট’ বা সাময়িক হিসেবমাত্র। তাতে পুলিশি লাঠিচার্জ, হিংসা ও নির্মমতার মূল অভিযোগগুলি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা পর্যবেক্ষণ ছিল না।

সর্বোচ্চ আদালত তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দিয়ে বলেছে—এ যাবৎ পাওয়া সমস্ত নথিপত্র, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। সেইসঙ্গে ঘটনার দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিক ও কর্মীদের তলব করে তাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি জবাবদিহি চাইতে হবে।

আইনজীবীদের জমা দেওয়া ডিজিটাল প্রমাণেরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

সুপ্রিম কোর্ট এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, তদন্ত প্যানেলকে শুধু সরাসরি আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তদন্তের পরিধি সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নির্যাতিতদের পক্ষে তাঁদের আইনজীবীরা কিংবা অন্য সাধারণ মানুষ যে সমস্ত অভিযোগপত্র, সংগৃহীত ভিডিও ক্লিপ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রমাণ জমা দিয়েছেন, সেগুলিরও সমান নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে তদন্তকারী প্যানেলকে।

উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন এক বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি আদালতকে জানিয়েছিল যে, ২০ জুলাইয়ের সহিংস ঘটনায় খুব বেশি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ সরাসরি জমা পড়েনি। যদিও সিজেপি (CJP)-র নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনে ঘটনার বিচার চেয়ে একাধিক ছাত্র সংগঠন ও মানবাধিকার রক্ষা গোষ্ঠী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল।

আন্দোলনের অতীত ঘটনাবলী ও বর্তমান অবস্থান

আন্দোলনের সূচনা
২০ জুন ২০২৬

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন শুরু হয়।

সংসদ অভিযান ও চরম সংঘর্ষ
২০ জুলাই ২০২৬

শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও কড়া লাঠিচার্জ চালায় পুলিশ।

শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা ও আন্দোলন প্রত্যাহার
২৫ জুলাই ২০২৬

তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং দাবি মেনে নেওয়ায় দীর্ঘ ৫ সপ্তাহের আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের প্যানেল গঠন
আগস্ট ২০২৬

পুলিশি তাণ্ডব ও অমানবিক আচরণের নিরপেক্ষ তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে বিশেষ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়।

সর্বোচ্চ আদালতের ১ মাসের অল্টিমেটাম
৫ নভেম্বর ২০২৬

আদালত ১ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশের নির্দেশ দেয় এবং আগামী ২ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করে।

২ ডিসেম্বর চূড়ান্ত ফয়সালার পথ

তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই দিনের ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত ও তথ্য জানতে দেশের প্রায় ১৪৯টি সংবাদপত্রে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এবং অনলাইন পোর্টাল ও সরাসরি অফিসে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে আদালতের বৃহস্পতিবারের কড়া বার্তার পর প্যানেলকে দ্রুত গতিতেই কাজ শেষ করতে হচ্ছে। আগামী ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে এই চাঞ্চল্যকর মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন বিচারপতিরা।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *