. “আমি তোর মেয়ে হয়ে থাকব!” নিঃসন্তান ভক্তের স্বপ্নে অলৌকিক নির্দেশ, ৩০০ বছর ধরে অটুট বর্ধমানের ‘ভৈরবেশ্বরী কালী’র কাহিনি

এক অন্ধকার নিস্তব্ধ রাতে চোখের জলে ভাসছিলেন নিঃসন্তান ভক্ত। মনে একটাই আকুতি—বংশের প্রদীপ জ্বালানোর জন্য একটি সন্তান চাই। কিন্তু পরম আরাধ্যা মা কালী যে তাঁর সেই প্রার্থনার উত্তরে এক অদ্ভুত স্বপ্নাদেশ দেবেন এবং নিজের আরাধ্য দেবীকেই তিনি ঘরের মেয়েরূপে পাবেন, তা কে জানত! আর সেই কালজয়ী স্বপ্ন থেকেই সূচনা হয়েছিল বর্ধমানের এক প্রাচীন ও রহস্যময় কালীক্ষেত্রের ইতিহাস।

বর্ধমান শহরের ১ নম্বর শ্যামবাজার লেনের এক নিরিবিলি কোণে আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন ‘ভৈরবেশ্বরী কালী মন্দির’। ঐতিহ্য ও লোকাচারের এমন বিরল সংমিশ্রণ খুব কম মন্দিরেই দেখা যায়। বিশ্বাস ও পরম্পরা এতটাই নিখাঁদ যে, আজও পোনা মাছের বিশেষ টক ছাড়া দেবীর মূল ভোগ নিবেদন করা সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়।

কীভাবে সূচনা হলো ভৈরবেশ্বরী কালীর আরাধনা?

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভৈরবচাঁদ কাপুর ছিলেন বর্ধমান রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত এক অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ভক্ত। দীর্ঘদিন ধরে সন্তান না হওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছিলেন তিনি। প্রতিদিন দেবীর চরণে আকুল প্রার্থনা জানাতেন। একদিন গভীর রাতে দেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বাস দেন, আর মনখারাপ করার প্রয়োজন নেই—মা নিজেই তাঁর ঘরে কন্যারূপে বাস করবেন।

স্বপ্নাদেশে জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পান ভৈরবচাঁদ। যে সন্তানকে তিনি চেয়েছিলেন, সেই সাক্ষাৎ জগজ্জননীকেই নিজের মেয়েরূপে পাওয়ার অলৌকিক বিশ্বাস জন্মায় তাঁর মনে। এরপর তিনি একটি ছোট মন্দির তৈরি করে দেবীর আরাধনা শুরু করেন। জনশ্রুতি রয়েছে, মাঘ মাসের রটন্তী চতুর্দশীর দিন নিমকাঠের বিগ্রহে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। ভৈরবচাঁদ কাপুরের নামানুসারেই দেবীর নাম রাখা হয় ‘ভৈরবেশ্বরী কালী’। ভক্তদের বিশ্বাসে তিনি আজও এই মন্দিরে আরাধ্য দেবীর পাশাপাশি ‘ঘরের মেয়ে’।

বিরল নিমকাঠের বিগ্রহ ও তন্ত্রমতের পুজো

বর্ধমান শহরের ব্যস্ততার মাঝে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পাশের পুকুরঘাট ধরে এগোলেই চোখে পড়ে এই প্রাচীন মন্দিরটি। বাইরে শহরের কোলাহল থাকলেও, ভেতরে পা রাখলেই অনুভুত হয় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ও অলৌকিক ছায়া।

  • অলৌকিক বিগ্রহ: প্রায় ৪ ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তিটি সম্পূর্ণ নিমকাঠের তৈরি। দক্ষিণাকালী রূপে পূজিতা হন দেবী। মন্দিরের পুরোহিত গোপাল ভট্টাচার্যের দাবি, একটিমাত্র নিমকাঠের ভেতরেই দেবীর মস্তক থেকে শুরু করে নিচে শায়িত মহাকাল ভৈরব পর্যন্ত পুরো বিগ্রহটি খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। পুরীর শ্রীজগন্নাথদেবের বিগ্রহের পর এককাঠে খোদাই করা এমন নির্মাণশৈলী সমগ্র ভারতের বুকে বিরল।

  • তন্ত্রমতে আরাধনা: স্থানীয় বাসিন্দা সুজিত চৌধুরী জানান, প্রাচীন কাল থেকেই এখানে জাঁকজমক এড়িয়ে কঠোর তান্ত্রিক নিয়ম ও ষোড়শোপচারে সন্ধ্যাপুজো ও হোম সম্পাদন করা হয়। ছাগবলির পাশাপাশি চালকুমড়ো, নারকেল, আখ ও মণ্ড বলির রীতিও অটুট রয়েছে।

পোনা মাছের টক ও বিশেষ রকমারি ভোগ

ভৈরবেশ্বরী কালীর ভোগের মেনুও বেশ ব্যতিক্রমী। ঐতিহ্য অনুযায়ী, মায়ের ভোগের থালায় ‘পোনা মাছের টক’ থাকা বাধ্যতামূলক। অমাবস্যা ও রটন্তী চতুর্দশীতে বিশেষ পূজার দিনে মাছের টকের পাশাপাশি নিবেদন করা হয় রাজভোগ, খিচুড়ি, নানা পদের ভাজাভুজি, নবরত্ন তরকারি ও পায়েস। দীপান্বিতা অমাবস্যা ও কালীপুজোর দিনে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার ভক্তের মধ্যে এই মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।

এছাড়া মন্দির চত্বরে রয়েছে একটি অলৌকিক ও বিশেষ প্রাচীন গাছ। কালসর্প দোষ থেকে মুক্তি পেতে বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এখানে এসে পুজো দেন। সময় বদলেছে, বদলেছে শহরের কাঠামোও; কিন্তু গত তিন শতাব্দী ধরে একই ভক্তি ও নিষ্ঠায় বর্ধমানের এই মন্দিরে পূজিতা হয়ে আসছেন নিমকাঠের ‘ভৈরবেশ্বরী কালী’।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *