পুকুরের তলদেশ থেকে উঠে এল নিখোঁজ মেয়ে! ৪৫০ বছর ধরে বাড়ির মেয়েকেই মা কালী রূপে পুজো করা হচ্ছে দুর্গাপুরে

সাধারণ এক মানবী থেকে সাক্ষাৎ দেবী রূপে আবির্ভূত হওয়ার শিহরণ জাগানো ঘটনার সাক্ষী পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের আমরাই গ্রাম। যেখানে নিজের বাড়ির আদরের মেয়েই একদিন হয়ে উঠলেন মা কালী! সেই ‘কল্যাণী কালী’ দেবী রূপেই বিগত সাড়ে চার শতাব্দী ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন। আমরাই গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের এই বিশেষ পুজোকে কেন্দ্র করে চার শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য, ভক্তি আর অলৌকিক বিশ্বাসের মেলবন্ধন আজও সমানভাবে জীবিত।
যেভাবে মানবী থেকে দেবী হয়ে উঠেছিলেন কল্যাণী
জনশ্রুতি এবং পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে, প্রায় ৪৫০ বছর আগে কাটোয়ার বন্দিঘাঁটি গ্রাম থেকে এসে আমরাই গ্রামে মামার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর এক ছেলে কৃষ্ণমোহন এবং এক মেয়ে কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিন গ্রামের উত্তর প্রান্তে চারদিকে জঙ্গল ঘেরা ‘তামলাপুকুরে’ বান্ধবীদের সঙ্গে স্নান করতে যান কল্যাণী।
জল চঞ্চল এক বান্ধবী আচমকাই পায়ে কিছু লাগায় ভয়ে ডাঙায় উঠে আসে। তা শুনে ডাকাবুকো স্বভাবের কল্যাণী নিজেই জলে নামেন কী আছে দেখতে। কিন্তু জলে নামতেই মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যান তিনি। সারাদিন ধরে ঘুনি জাল ফেলে গোটা পুকুর তোলপাড় করেও কল্যাণীর কোনো সন্ধান মেলেনি।
অবশেষে পরিবার ও গ্রামবাসীরা সিদ্ধান্ত নেন তামলাপুকুরের এক কোণ কেটে জল সব বের করে দেওয়া হবে। সেইমতো গ্রামের বাউরি পাড়ার মানুষ মাটি কাটা শুরু করে। রাত ঘনাতেই ক্লান্ত হয়ে পুকুরপাড়ে ঘুমিয়ে পড়েন কল্যাণীর দাদা কৃষ্ণমোহন। আর ঠিক তখনই তিনি শোনেন সেই অলৌকিক স্বপ্নাদেশ—“আমি মা কালী বলছি… কাল সকালে সূর্যোদয়ের সময় কল্যাণী এই পুকুর থেকেই উঠে আসবে। তোরা পুকুর কাটা বন্ধ কর। সকালে ঢাক নিয়ে হাজির থাকিস।”
অলৌকিক ‘ব্রহ্মকলস’ ও ঐতিহাসিক সত্য
পরদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগে তামলাপুকুরের পাড়ে হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হন। ঠিক তখনই দেখা যায় এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য! পুকুরের ঈশান কোণে জল থেকে মাথায় একটি পবিত্র কলসি (ব্রহ্মকলস) নিয়ে সশরীরে হেঁটে উপরে উঠে আসেন কল্যাণী!
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এক অলৌকিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে কল্যাণী সকলকে জানান—তিনি আর সাধারণ কোনো মেয়ে নন, দেবী জগদম্বারই রূপ। এর পরেই তাঁর নির্দেশে শুরু হয় পুজো। আজও ঘরের মেয়ে হিসেবেই তিনি পূজিতা হন।
যে কলসি মাথায় নিয়ে কল্যাণী উঠে এসেছিলেন, সেই অলৌকিক ‘ব্রহ্মকলস’ আজও মন্দিরে সযত্নে রক্ষিত। সোনা, রূপা, তামা-সহ পঞ্চধাতু দিয়ে তৈরি একটি পদ্মাকৃতির ‘শ্রীযন্ত্র’ দিয়ে এটি ঢাকা থাকে। কথিত আছে, তারাপীঠের পর একমাত্র এই মন্দিরেই এমন শ্রীযন্ত্র রয়েছে। বছরের মাত্র একদিন, দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে এই কলসির জল পরিবর্তন করা হয়। আর সেই জল মুমূর্ষু রোগীর গায়ে ছিটিয়ে দিলে কঠিন রোগ দূর হয় বলে ভক্তদের প্রবল বিশ্বাস।
১ টাকায় প্রতিমা গড়া ও ঐতিহাসিক প্রথা
এই মূর্তির কারিগর ফেলারাম সূত্রধর জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষের আমল থেকেই মাত্র ১ টাকা পারিশ্রমিকে এই বিশেষ প্রতিমা তৈরি করা হয়। তবে সেই ১ টাকাও তাঁরা দেবীর চরণে প্রণামী হিসেবে ফিরিয়ে দেন।
প্রতি বছর দীপান্বিতা অমাবস্যায় তামলাপুকুর থেকে দণ্ডি কেটে শত শত ভক্ত মানত করতে আসেন। পুজোর পরদিন মায়ের মহাভোগ রান্না করে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। আজও সারারাত ধরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে ঘরের মেয়ে কল্যাণী পূজিতা হন পরম শক্তিধারিণী মা কল্যাণী কালী রূপে।