“হাইকোর্ট এখতিয়ার পেরিয়েছে!” তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী নটরাজ মন্দির মামলায় বিরাট মোড়, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে শোরগোল!

তামিলনাড়ুর বিশ্বপ্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী চিদম্বরম শ্রী নটরাজ মন্দিরের (Chidambaram Nataraja Temple) পরিচালন ভার নিয়ে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর মোড় এল। মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব পাঁচ সদস্যের নতুন ট্রাস্ট বোর্ডের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মাদ্রাজ হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিল, তাতে বড়সড় স্থগিতা দেশ জারি করল দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বংশানুক্রমিক পূজারি গোষ্ঠী ‘পোতু দীক্ষিতার’-দের দায়ের করা বিশেষ লিভ পিটিশনের ওপর শুনানি শেষে এই তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

বিতর্কের আসল সূত্রপাত কীভাবে?

ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের মে মাসে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারের জারি করা একটি বিতর্কিত নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে। সরকারের ওই নির্দেশে সাধারণ ভক্তদের মন্দিরের পরম পবিত্র ও উঁচু বেদি ‘কনকসভা’য় উঠে বিশেষ পূজা ও দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন মন্দিরের দীর্ঘদিনের বংশানুক্রমিক পূজারি গোষ্ঠী পোতু দীক্ষিতাররা। তাঁদের যুক্তি ছিল, সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতায় রাজ্য সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি হস্তক্ষেপের সামিল।

তবে গত ৩০ অক্টোবর মাদ্রাজ হাইকোর্ট সরকারের নির্দেশকেই বহাল রাখে এবং পর্যবেক্ষণ জানায় যে, ভক্তরা কনকসভায় উঠলে মন্দিরের প্রথা বা আচারে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না।

হাইকোর্টের নির্দেশে ট্রাস্ট বোর্ড গঠন ও দীক্ষিতারদের আপত্তি

মামলাটি কেবল ‘কনকসভা’ দর্শনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শুনানি চলাকালীন মাদ্রাজ হাইকোর্ট দাবি করে, আধুনিক নানাবিধ নির্মাণের ফলে প্রাচীন এই মন্দিরের কাঠামোগত ক্ষতি সাধিত হয়েছে। মন্দিরের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং বিপুল সম্পত্তির সঠিক পর্যালোচনার কথা বলে ২ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, ১ জন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক, হিন্দু ধর্মীয় দফতরের সচিব এবং দীক্ষিতারদের প্রতিনিধিকে নিয়ে ৫ সদস্যের পরিচালনা বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের এই একতরফা রায়ের বিরুদ্ধেই সোজা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন দীক্ষিতাররা। সুপ্রিম কোর্টে দীক্ষিতারদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী সি এস বৈদ্যনাথন জোরালো সওয়াল করে বলেন, হাইকোর্ট কেবল ‘কনকসভা’ মামলার শুনানি করতে গিয়ে মূল সীমানার বাইরে চলে গেছে। তিনি ২০১৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘সুব্রহ্মণ্যম স্বামী’ মামলার রেফারেন্স দিয়ে মনে করিয়ে দেন, সুপ্রিম কোর্ট আগেই স্পষ্ট জানিয়েছিল যে পোতু দীক্ষিতাররা একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং নটরাজ মন্দির পরিচালনার পূর্ণ আইনি ও ধর্মীয় অধিকার কেবল তাঁদেরই।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত স্থগিতাদেশ

অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রবেশপথসহ প্রাচীন বহু কাঠামো বিকৃত করা হয়েছে। তাই জবাবদিহি না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়া উচিত নয়।

তবে উভয় পক্ষের তুমুল সওয়াল-জবাব শোনার পর সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে—মন্দিরের কাঠামোগত পরিবর্তনের পেছনে দীক্ষিতাররাই দায়ী, তার কোনো নিরেট প্রমাণ রাজ্য সরকারের কাছে রয়েছে কি না? এরপরই সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, “সব পক্ষের বক্তব্য শুনে আমাদের বিচারবিবেচনাপ্রসূত মতামত হলো যে, চ্যালেঞ্জ করা হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেওয়া উচিত।” সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের ফলে আপাতত নিজেদের ঐতিহ্যবাহী অধিকার ও শাসনভার বজায় রাখতে সক্ষম হলেন পোতু দীক্ষিতাররা।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *