“সরকারি অফিসে স্থায়ী ধর্মীয় কাঠামো নয়!” ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে কেন্দ্র, পাল্টা সওয়াল সলমন খুরশিদের

নতুন দিল্লির হাই-প্রোফাইল কৃষি ভবন চত্বরে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন ‘কাদিমি মসজিদ’ ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম আইনি জটিলতা ও সংঘাত। কেন্দ্র সরকারের স্বপ্নের ‘সেন্ট্রাল ভিস্তা’ পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে নতুন সমন্বিত সরকারি সচিবালয় ভবন নির্মাণের স্বার্থে এই মসজিদটি সরিয়ে ফেলার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। দিল্লি হাইকোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়েছে, একটি সক্রিয় সরকারি দপ্তর চত্বরের ভেতরে কোনো ধরনের স্থায়ী ধর্মীয় কাঠামো থাকা উচিত নয় এবং তা সরকারি সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উল্লেখ্য, সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের অধীনে প্রস্তাবিত ‘কমন সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট’-এর ৪ ও ৫ নম্বর ভবন নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমির ওপরই বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মৌলিক অধিকারের সওয়াল
কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি আগেই দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কমিটির পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী সলমন খুরশিদ আদালতে সওয়াল করে বলেন, কাদিমি মসজিদটি প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেখানে রয়েছে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর কৃষি ভবন গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই এই মসজিদটি সেখানে বিদ্যমান।
আবেদনকারীরা ঐতিহাসিক নথিপত্র পেশ করে দাবি করেন, ১৯৪৫ সালের সরকারি রেকর্ডেও এই কাদিমি মসজিদের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং ১৯৭০ সালে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড এটিকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। তাছাড়া কৃষি ভবন ও শাস্ত্রী ভবনসহ আশপাশের সরকারি দপ্তরে কর্মরত মুসলিম কর্মচারীরা কাজের ফাঁকে দীর্ঘ দিন ধরে এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করে আসছেন। সেই সূত্রে সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের আওতায় কাঠামোটিকে ভাঙার হাত থেকে সুরক্ষার আর্জি জানানো হয়েছে।
কেন্দ্রের পাল্টা যুক্তি ও ১৯৪০ সালের চুক্তি
পাল্টা যুক্তিতে কেন্দ্র সরকার ১৯৪০ সালের ৮ নভেম্বরের একটি অতি পুরনো চুক্তির প্রসঙ্গ আদালতে তুলে ধরেছে। কেন্দ্রের ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (L&DO) রিপোর্ট অনুযায়ী, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন ও জামা মসজিদের পরিচালন কমিটির মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল— ওই জমিটি স্রেফ মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করার শর্তসাপেক্ষ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত মালিকানাস্বত্ব বা স্থায়ী অধিকার হস্তান্তর করা হয়নি।
এমনকি সরকারের লিখিত অনুমতি ছাড়া সেখানে কোনো প্রকার সংস্কার বা বাড়তি কাঠামো নির্মাণের ওপরও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। কেন্দ্রের স্পষ্ট বক্তব্য, যেহেতু জমির আসল মালিকানা এখনও সরকারের হাতেই রয়েছে, তাই জাতীয় স্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে মসজিদটি সেখান থেকে স্থানান্তর করা পুরোপুরি আইনসম্মত। উভয় পক্ষের এই তীব্র আইনি ও ঐতিহাসিক বাকযুদ্ধের মধ্যে এখন দিল্লি হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ওয়াকফ বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।