আমেরিকার ক্ষমতার হাতবদল নাকি ট্রাম্পের মাস্টারস্ট্রোক? মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোন জাদুকরী ফলাফলের অপেক্ষায় বিশ্ব?

দীর্ঘ কয়েকমাসব্যাপী টানটান প্রচারের লড়াই এবং শত শত কোটি ডলারের বিপুল আর্থিক ব্যয়ের পর অবশেষে মার্কিন মুলুকে এসে উপস্থিত হয়েছে সেই বহু প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক দিন। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে (US Midterm Elections) আমেরিকার ভাগ্য নির্ধারণে এখন চলছে চূড়ান্ত ভোটগ্রহণ। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলির ইঙ্গিত বলছে, ডেমোক্র্যাট শিবির কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে; তবে রাজনীতিতে জরিপ সবসময় শেষ কথা বলে না, ফলে এবারের নির্বাচনেও বেশ কিছু বড় ও অপ্রত্যাশিত চমক আসার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে।

আমেরিকানরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার পর মূলত তিনটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশ্ব রাজনীতি। কোন পথে মোড় নিতে পারে মার্কিন কংগ্রস এবং ফলাফল আসার প্রাথমিক লক্ষণগুলি কী কী হতে পারে, একনজরে তা দেখে নেওয়া যাক:

১. একটি বড় গণতান্ত্রিক ঢেউ (The Democratic Wave)

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বা প্রেসিডেন্টের দলই বিপাকে পড়ে এবং বিরোধী দল বাড়তি সুবিধা আদায় করে নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান রাষ্ট্রপতির তুলনামূলক নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা ও যুদ্ধ যা মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং কঠোর অভিবাসন নীতির মতো কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। এই সমস্ত কারণ মিলে তৈরি হয়েছে এক তীব্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুকূল পরিবেশ।

এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা কেবল প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে নেবে না, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় জাদুকরী ২১৮টি আসনকে তারা বহুগুণে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি সিনেটের লড়াইয়েও ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল রাজ্যগুলিতে বড় ধরনের চমক দেখাতে পারে তারা, যা ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক তীব্র তিরস্কারস্বরূপ হবে।

  • ফলাফল বোঝার প্রাথমিক লক্ষণ: ডেমোক্র্যাটরা যদি ফ্লোরিডার নির্দিষ্ট হাউস আসনগুলিতে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে, নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক, ভার্জিনিয়া ও কেন্টাকির মতো রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রণাধীন জেলাগুলিতে জয় ছিনিয়ে নেয় এবং সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেট আসনটি দখল করে, তবে বুঝতে হবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য দারুণ একটি রাত অপেক্ষা করছে।

২. গণতান্ত্রিক ক্ষীণ ধারা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা (The Narrow Democratic Edge)

যদি জনমত জরিপগুলি পুরোপুরি ভুল না হয়, আবার একশো শতাংশ সঠিকও না হয়, তবে তৈরি হতে পারে এই দ্বিতীয় পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত আসন হয়তো পেয়ে যাবে, কিন্তু সেই বিজয়ের ব্যবধান হবে খুবই সামান্য। এর ফলে আইন পাসের জন্য সংসদের ডেমোক্র্যাটিক নেতাদের প্রতিনিয়ত বাম ও মধ্যপন্থী প্রান্তিক সদস্যদের সঙ্গে দেনদরবার ও বোঝাপড়া করতে হবে। আর সিনেটের ক্ষেত্রে লড়াই এতটাই হাড্ডাহাড্ডি হবে যে রক্ষণশীল এলাকাগুলি ডেমোক্র্যাটদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। এর অনিবার্য ফল হিসেবে মার্কিন কংগ্রেস বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং দেখা দেবে তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা।

  • ফলাফল বোঝার প্রাথমিক লক্ষণ: ফ্লোরিডায় যদি রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ স্বস্তিদায়কভাবে বজায় থাকে এবং ডেমোক্র্যাটরা ভার্জিনিয়া বা পেনসিলভেনিয়ার মতো জায়গায় কিছু আসন পেলেও দেশজুড়ে থাকা সুরক্ষিত রিপাবলিকান প্রার্থীরা যদি জনস্রোতে ভেসে না যান, তবে এই ‘ক্ষীণ ধারা’র পরিস্থিতিই বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।

৩. রিপাবলিকানদের বাজিমাত ও ট্রাম্পের জয়রথ (A Strong Republican Night)

তৃতীয় এবং শেষ সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে, জনমত জরিপগুলিকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে নিজেদের দখলে ধরে রাখতে পারে। শুধু যে রিপাবলিকান ভোটাররাই রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিতে আসবেন তা নয়, বরং ট্রাম্পের নীতিতে অসন্তুষ্ট স্বতন্ত্র ও হিস্পানিক ভোটারদের বড় একটা অংশও শেষ পর্যন্ত তাঁদের পক্ষেই রায় দিতে পারে।

এমনটা ঘটলে, টেক্সাস, ফ্লোরিডা এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো রাজ্যগুলিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের (Gerrymandering) সুবাদে রিপাবলিকানরা সামান্য ব্যবধানে হলেও সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে। ফলস্বরূপ, ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার সকালেই নতুন নির্বাচনী ম্যান্ডেট দাবি করতে পারেন এবং নিজের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিগুলি আরও আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লাইসেন্স পেয়ে যাবেন।

মার্কিন রাজনৈতিক ময়দানের এই তিন মহা-সম্ভাবনার কোনটির চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *