রিলেশনে থেকেও ব্যাকআপ সঙ্গীর খোঁজ? সঙ্গীর এই গোপন অভ্যাস চেনার মারাত্মক লক্ষণ জানুন!

আপনি কি একটি সম্পর্কে থেকেও অন্য কারো সঙ্গে প্রতিনিয়ত ফ্লার্টিং বা অতিরিক্ত আবেগঘন যোগাযোগ রাখছেন, যাতে বর্তমান সম্পর্ক ভেঙে গেলে একা হয়ে যেতে না হয়? কিংবা আপনার সঙ্গী কি গোপনে এমনটা করছেন? মনস্তত্ত্বের ভাষায় এই মারাত্মক প্রবণতার নাম ‘কুশনিং’ (Cushioning)। আপাতদৃষ্টিতে একে নির্দোষ বন্ধুত্ব বা স্রেফ একটু ‘ফ্লার্টিং’ মনে হলেও, এটি আসলে ভালোবাসার মানুষকে অন্ধকারে রেখে অন্য কাউকে জীবনের ‘রোমান্টিক ব্যাকআপ’ হিসেবে ধরে রাখার এক চতুর কৌশল।
সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক ডেটিং অ্যাপগুলোর দৌলতে আজকাল ‘কুশনিং’ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু কোথায় সাধারণ বন্ধুত্বের সীমা শেষ আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু— তা নিয়ে ধন্দে বহু দম্পতি। বেঙ্গালুরুর অ্যাস্টার সিএমআই হাসপাতালের প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারধী সি (Dr Sharadhi C) এই বিষাক্ত মানসিক প্রবণতা, এর লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
‘কুশনিং’ এবং সাধারণ বন্ধুত্বের ফারাক কোথায়?
ডক্টর শারধীর মতে, সুস্থ ও স্বাভাবিক বন্ধুত্বে কোনো গোপনীয়তা থাকে না এবং তা সম্পর্কের সততাকে সম্মান জানায়। কিন্তু ‘কুশনিং’-এর পেছনে মূল উদ্দেশ্যই হলো বর্তমান সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে অন্য কাউকে তৈরি রাখা। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে ইমোশনাল ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা হয় এবং সেই কথা সঙ্গীর কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়।
মানুষ কেন সম্পর্কে ‘কুশনিং’ করে?
১. প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা একা হয়ে যাওয়ার ভয়: অনেক মানুষ একা থাকার ভয় বা রিজেকশনের আশঙ্কায় ভুগে থাকে। ব্যাকআপ সঙ্গী থাকলে তারা নিরাপদ বোধ করে।
২. অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা: অতীতে প্রেম ভেঙে যাওয়া বা প্রতারিত হওয়ার ভয় থেকেও অনেকে এই ভুল পথ বেছে নেন।
৩. মানসিক অপরিপক্কতা: সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, সস্তা অ্যাটেনশন পাওয়ার চেষ্টা এবং সঙ্গীর সাথে খোলাখুলি কথা বলতে না পারা ‘কুশনিং’-এর অন্যতম কারণ।
৪. ডিজিটাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা: হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা ডেটিং অ্যাপের ‘ডিসঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ’ বা প্রাইভেট চ্যাটের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গোপনে এই সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখা সহজ হয়।
সঙ্গীর মধ্যে ‘কুশনিং’-এর প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?
অতিরিক্ত গোপনীয়তা: ফোন চ্যাটিং নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা বা পাসওয়ার্ড লুকানো।
মেসেজ মুছে ফেলা: নির্দিষ্ট কোনো বন্ধুর সাথে কথোপকথন নিয়মিত মুছে ফেলা।
প্রতিরক্ষামূলক মেজাজ (Defensive): কোনো বিশেষ বন্ধুত্বের বিষয়ে প্রশ্ন করলেই রেগে যাওয়া বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা।
আবেগীয় দূরত্ব: আপনার জন্য কম সময় দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা ফোনে অন্যের জন্য আবেগ ঢেলে দেওয়া।
মানসিক প্রভাব ও সম্পর্কের পরিণতি
যিনি ‘কুশনিং’-এর শিকার হন, ঘটনা জানাজানি হলে তাঁর আত্মবিশ্বাস ধুলিসাৎ হয়ে যায়। তিনি তীব্র হীনমন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা ও অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি কুশনিং করছেন, তিনিও অপরাধবোধ ও ধরা পড়ার ভয়ে থাকেন। ফলে দু’জনের মধ্যেই দূরত্ব তৈরি হয় এবং বিশ্বাসের স্তম্ভ চিরতরে ভেঙে পড়ে।
কীভাবে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসবেন?
১. সরাসরি অভিযোগ নয়, শান্তভাবে আলোচনা: সঙ্গীকে সরাসরি ‘দোষী’ না বানিয়ে শান্ত মুহূর্তে বসুন। বলুন— “অমুক বিষয়টি আমার খারাপ লাগছে, এতে আমাদের বিশ্বাসের অভাব ঘটছে।”
২. নিজের ভুল স্বীকার করা: আপনি যদি নিজে কুশনিং করে থাকেন, তবে নিজের মনের কাছে সৎ হন। বর্তমান সম্পর্কের প্রতি কমিটেড থাকলে বাকিদের সাথে সমস্ত অতিরিক্ত মেলামেশার কড়া সীমারেখা (Boundaries) টেনে দিন।
৩. কাউন্সেলিং ও সিদ্ধান্ত: যদি আপনারা নিজেরাই জটিলতা কাটাতে না পারেন, তবে রিলেশনশিপ কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। আর সঙ্গী যদি বারবার মিথ্যা বলে এবং সীমা লঙ্ঘন শুধরাতে অস্বীকার করে, তবে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে সেই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ কথা: কোনো নজরদারি বা ফোন চেক করে বিশ্বাস ধরে রাখা যায় না। সম্পর্কের আসল ভিত্তি হলো সততা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
(ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। কোনো মানসিক বা পারিবারিক সমস্যার জটিলতায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।)