স্বামীর হাড়হিম করা চক্রান্তের বলি ভারতীয় যুবতী, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলো পরিবার

প্রায় মাসখানেক আগে সুদূর আমেরিকায় দাম্পত্য কলহ ও পাশবিক নির্যাতনের বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন লুধিয়ানার ৩০ বছর বয়সী ভারতীয় যুবতী জেসমিন গিল। নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বর্তমানে জেলবন্দি নিহত যুবতীর স্বামী। তবে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মাঝে মাত্র আট মাসের দুধের শিশুটি এখন আমেরিকার ‘ফস্টার কেয়ার’-এ অনাথের মতো দিন কাটাচ্ছে। এবার নাতিকে ভারতে নিজেদের কোলে ফিরিয়ে আনতে সোজা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দ্বারস্থ হলো লুধিয়ানার পরিবার।
লুধিয়ানার বাসিন্দা জেসমিনের মা সুখবিন্দর কৌর ও তাঁর পরিবার কেবল প্রধানমন্ত্রী নন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানকেও জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। তাঁদের আকুল আর্জি, ভারত সরকার যেন অবিলম্বে মার্কিন প্রশাসনের সাথে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে আট মাসের শিশুটির কাস্টডি (রক্ষাণাবেক্ষণ) তাদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
আমেরিকায় কী ঘটেছিল?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোর নিজের বাড়ি থেকেই গত ৩০ সেপ্টেম্বর আচমকা নিখোঁজ হয়ে যান জেসমিন গিল। এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ১ অক্টোবর, স্যাক্রামেন্টো থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে অবস্থিত এল ডোরাডো কাউন্টির এক নির্জন এলাকা থেকে জেসমিনের দগ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তে নেমে মার্কিন পুলিশ জেসমিনের স্বামী গুরিন্দরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি দাবি করেন, জেসমিনকে নাকি আমেরিকার ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ (ICE)-এর আধিকারিকরা আটক করে নিয়ে গিয়েছেন। তবে পুলিশি অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই দপ্তর জেসমিনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই করেনি। উপরন্তু, জেসমিনের ভিসার মেয়াদ আরও চার বছর বাকি ছিল। তদন্তে আরও উঠে আসে, গুরিন্দর ও জেসমিনের মধ্যে তীব্র বিবাহবিচ্ছেদের মামলা চলছিল এবং ৮ মাসের শিশুসন্তান জুগাদ কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে টানাটানি চলছিল। বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি মেলায় গত ১৪ অক্টোবর গুরিন্দরকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন পুলিশ। বর্তমানে তিনি স্যাক্রামেন্টো কাউন্টি জেলে বন্দি।
“মেয়ের হৃদস্পন্দন বেঁচে আছে ওই বাচ্চার মধ্যে”
জেসমিনের মা সুখবিন্দর কৌর চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলেন, “আমার মেয়ের পুরো জীবনটাই এই ছোট বাচ্চাটাকে ঘিরে ছিল। প্রতিদিনের নির্মম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও ও সন্তানকে মানুষ করতে চেয়েছিল। রোজ আমাকে নাতির ভিডিও পাঠাত। আমার মেয়ের পুড়ে যাওয়া আত্মাটায় শান্তি আসবে না, যতদিন না ওর সন্তান আমাদের বুকে ফিরছে। আমরা জানিও না আমার মেয়েকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল নাকি মারার পর পোড়ানো হয়েছে! ওর হৃদস্পন্দন এখন ওই টুকটুকে বাচ্চার মধ্যেই বেঁচে আছে। আমি ওকে আঁকড়ে ধরে মেয়েকে ছুঁতে চাই।”
জেসমিনের ভাই কবি পাশ আজ়াদও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি জানান, “বিগত দু’বছর ধরে আমার বোন স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গর্ভাবস্থাতেও কেউ পাশে ছিল না। অত্যাচার সইতে না পেরে বোন আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। স্বামী ওকে বারবার মিথ্যা কথা বলে বিপথে চালিত করেছে এবং শেষমেশ খুন করল। আজ ওর মা বেঁচে নেই, বাবাও কাস্টডিতে। আট মাসের ছোট্ট শিশুটি এখন অচেনা ফস্টার কেয়ারে পড়ে রয়েছে। দ্রুত তাকে আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিক কেন্দ্র।”
এখন মার্কিন আদালত ও ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রকের জোড়া পদক্ষেপের দিকেই চাতক পাখির মতো চেয়ে রয়েছে লুধিয়ানার এই শোকগ্রস্ত পরিবার।