“জ্ঞানেশ কুমারকে জেলে যেতে হবে!” ভোট চুরির অভিযোগে মোদী-শাহকে চরম হুঁশিয়ারি রাহুলের

দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে আয়োজিত প্রতিবাদ সভাকে নিছক কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বলতে নারাজ লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর মতে, এটি দেশের সর্বস্তরের মানুষের একটি সম্মিলিত ও সর্বাত্মক প্রতিবাদ। এদিনের মহা-সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা দূরদূরান্ত থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন এবং নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। এটি কোনো একটি রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট কোনো নেতার কণ্ঠস্বর নয়; এটি দেশের আপামর যুবক, কৃষক এবং মেহনতি মানুষের সম্মিলিত গর্জন।”
গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার লড়াই
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে রাহুল বলেন, এই হুংকার পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে ভারতেই গণতন্ত্র এবং সংবিধানকে ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। শাসকশিবিরকে নিশানা করে তিনি আরও বলেন, “আপনাদের কাছে যত টাকাই থাকুক বা য্তই ক্ষমতার জোর থাকুক না কেন, আপনারা কোনোভাবেই দেশের সংবিধানের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারেন না।”
ভোটার তালিকা থেকে ১১.৫৩ কোটি নাম বাদ! সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তোলেন রাহুল। তাঁর অভিযোগ, দেশে দীর্ঘদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে ‘ভোট চুরি’ চলছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ভোট কারচুপি হয়েছে বলে বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি।
রাহুলের দাবি, শুধুমাত্র ইভিএম কারচুপি নয়, বরং ভোটার তালিকা থেকে সুকৌশলে নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন নাম সংযোজনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নয়ছয় করা হয়েছে। তাঁর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক পরপরই ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১১.৫৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের প্রতি সাত জন ভোটারের মধ্যে প্রায় একজনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে তাঁর দাবি।
পরিসংখ্যান টেনে তিনি জানান, সাম্প্রতিক নির্বাচনে এনডিএ এবং বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, অথচ তারপরেই প্রায় ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম তালিকা থেকে এক কলমের খোঁচায় বাদ দেওয়া হয়েছে। এই গুরুতর পরিসংখ্যান তুলে ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি আক্রমণ করে রাহুল বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে নিজের পদ থেকে শুধু সরে যেতে হবে তা নয়, তাঁকে জেলেও যেতে হবে। এটি কোনো সাধারণ ভুল বা ছোটখাটো চুরি নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ও কণ্ঠস্বর সুপরিকল্পিতভাবে চুরি করা হচ্ছে।” তাঁর এও দাবি, জ্ঞানেশ কুমার সহযোগিতা না করলে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতেন না।
‘শিক্ষা থেকে বিচারব্যবস্থা—সব নিয়ন্ত্রণ করছে আরএসএস’
দেশের প্রধান সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর আরএসএস (RSS)-এর একাধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও তোলেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্র, সিবিআই, ইডি, দেশের বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন—সবকটি সংস্থাকে কবজা করা হয়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজ, কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে রাহুল বলেন, দেশের মূল সম্পদ এবং পরিকাঠামোর বড় অংশ গুটিকয়েকম শিল্পপতির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে আদানি ও আম্বানির মতো শিল্পপতিদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সহজেই মকুব করা হয়, সেখানে একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সামান্য ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হলেই তাঁদের জেলে পাঠানো হয়।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আপনারা সবাই শিবের বিয়ের বরযাত্রার কথা শুনেছেন, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষের যোগ দেওয়ার এবং আনন্দে মেতে ওঠার সমান অধিকার থাকে। আমরা ঠিক তেমনই একটি ভারত গড়তে চাই। যেখানে দেশের একজন কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করলে তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন। একজন ছাত্র ১৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করে তার মেধা অনুযায়ী শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পাবে। আমরা এমন দেশ চাই না যেখানে দেশের প্রতিটি বিমানবন্দর, রেল, বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক কেবল বিশেষ এক বা দুই শিল্পপতির কুক্ষিগত হয়ে থাকবে।”
“পালানোর রাস্তা পাবেন না, আইনি পদক্ষেপ হবে”
কেন্দ্রীয় সরকারকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে রাহুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ চাইলেও কোথাও পালিয়ে যেতে পারবেন না। তাঁদের এই কাজের জন্য ভবিষ্যতে কঠোর আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
রাহুলের সাফ কথা, “অমিত শাহ বলেন নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাচ্ছেন না। আমি আপনাদের পরিষ্কার বলছি, উনি কোথাও যেতেও পারবেন না; আর যদি যেতে চানও, এ দেশের মানুষ ও আমরা তাঁকে পালাতে দেব না। জ্ঞানেশ কুমারের পর এবার আপনাদের জবাবদিহি করার পালা। আপনারা যে ভোট চুরি করেছেন এবং দেশকে বিক্রির চেষ্টা করেছেন, তার পূর্ণ হিসাব ও বিচার দেশের মানুষ নেবে।”
“আমরা ঘৃণা নয়, ভালোবাসার দোকান চালাই”
বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ এবং অহিংসার বার্তা তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, তাঁদের রাজনৈতিক লড়াইয়ে কেউ শত্রু নন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ কিংবা জ্ঞানেশ কুমার—কারও প্রতি তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ বা ঘৃণা নেই। তাঁরা হিংসা বা বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, বরং মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ ও পথ অনুসরণ করে চলেন।
রাহুল বলেন, “আমাদের ধর্ম কাউকে ঘৃণা করতে শেখায় না। সমাজের একেবারে শেষ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং অধিকার রক্ষা করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। সেই মানুষটি হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিত, আদিবাসী কিংবা নারী—যেই হোন না কেন, তাঁর পাশে থাকা আমাদের কর্তব্য।”
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান সরকারের ভুল নীতি এবং ঘৃণার রাজনীতির কারণে আজ দেশের আত্মা আর্তনাদ করছে। দেশের তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে প্রতিটি সাধারণ নাগরিক আজ শান্তি ও ভালোবাসা চান। এই প্রতিবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার এক ঐতিহাসিক লড়াই।