“ভোটের অধিকার না ফিরলে কোন পুরভোট নয়!” রাজ্য নির্বাচন কমিশনে একজোট বিরোধীরা, নজিরবিহীন আন্দোলন

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ‘যোগ্য’ নাগরিকদের ভোটাধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত কলকাতা, হাওড়া-সহ রাজ্যের কোনো পুরসভা বা পুরনিগমের নির্বাচন আয়োজন করা যাবে না— এই দাবি তুলে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দুয়ারে কড়া নাড়ল রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির যৌথ প্ল্যাটফর্ম ‘আমার ভোট ফিরিয়ে দাও’।
বুধবার বিকেলে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার কৃষ্ণ গুপ্তের সঙ্গে সাক্ষাত করে এক উচ্চপর্যায়ের স্মারকলিপি জমা দেয় বাম, কংগ্রেস ও বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধি দল।
১.৬ লাখ ভোটারের ভাগ্য ঝুলছে ট্রাইব্যুনালে!
বৈঠক শেষে যৌথ মঞ্চের পক্ষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু এক বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় যাদের নাম অকারণে বাদ পড়েছিল, সেই অধিকার ফিরে পেতে বহু মানুষ অ্যাপেলেট ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ইতোমধ্যেই ট্রাইব্যুনালে শুনানি সম্পন্ন হওয়া মামলাগুলির ক্ষেত্রে কলকাতার ১০০ শতাংশ এবং হাওড়ার ৯৯ শতাংশ ভোটারের পক্ষেই রায় এসেছে, অর্থাৎ তাঁদের নাম তালিকায় পুনর্নবিীকরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বর্তমানে অ্যাপেলেট ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১.৬ লাখ আবেদনকারীর বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে— যার মধ্যে শুধু কলকাতারই প্রায় ১.২ লাখ এবং হাওড়া পুরনিগমের প্রায় ৩৯ হাজার নাগরিক রয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনের মতো যদি পুরভোটেও এঁদের বাদ দিয়ে ভোট করা হয়, তবে তাঁরা ফের নিজেদের মৌলিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। যতক্ষণ না ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁদের নাম তালিকায় ফিরছে, ততক্ষণ পুরভোট স্থগিত রাখতে হবে।”
কমিশনের প্রতিক্রিয়া ও আইনি এক্তিয়ার
বিরোধীদের স্মারকলিপির প্রেক্ষিতে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ও দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের মূল ভূমিকা থাকে। সরকার কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের সময় বাদ পড়া ভোটারদের এই গুরুতর বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে বলে আশ্বস্ত করেছে কমিশন।
অন্যদিকে, বৈঠকে উপস্থিত মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র এবং সিপিআই(এম) নেতা কল্লোল মজুমদার কমিশনের আইনি ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেন। তাঁরা জানান, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সংবিধিবদ্ধ আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাজ্য সরকারের নির্দিষ্ট করা কোনো তারিখের ওপর নির্ভর না করে কমিশন চাইলে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে একটি আলাদা ও নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরি করে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। মঞ্চের তরফে সেই আইনি পথ অনুসরণের দাবিও জানানো হয়েছে।
“বিজেপি সরকারের কোনো জনভিত্তি নেই”, আক্রমণ বসুন্ধরার
প্রতিনিধি দলে থাকা তৃণমূলের (কালীঘাট শিবির) নেত্রী বসুন্ধরা গোস্বামী বিরোধীদের সুরের চেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে রাজ্য সরকারকে নিশানা করেন। কড়া আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, “যাদের জন্য পুরসভার কাজ, সেই ভোটাররাই যদি নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন, তবে পুরভোট করার যৌক্তিকতা কোথায়?”
বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকারকে তোপ দেগে ক্ষিতি-তনয়া বসুন্ধরা আরও দাবি করেন, “বর্তমানে রাজ্যে যে বিজেপি সরকার চলছে, তার কোনো নৈতিক বা প্রশাসনিক বৈধতা নেই। কারণ তারা সাধারণ মানুষের প্রকৃত রায়ে নির্বাচিত হয়ে আসেনি। রাজ্যের বিরোধী দলগুলি বিজেপির কোনো নির্দিষ্ট নীতির কাছে পরাজিত হয়নি, বরং একটি ক্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার শিকার হয়েছে। তাই সেই একই প্রহসনের পুনরাবৃত্তি পুরভোটে হতে দেওয়া যাবে না।”
সব মিলিয়ে, পুরভোটের আগে ভোটার তালিকার গলদ ও ১.৬ লাখ নাগরিকের নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য নির্বাচন কমিশন চত্বর এখন রাজ্য রাজনীতির উত্তপ্ত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে