“শান্তিনিকেতন ভ্রমণ এবার সুপারহিট!” ৩০০ বছরের পুরনো রাজবাড়িতে ঢুকতেই মাথাপিছু মাত্র ৫ টাকা?

শান্তিনিকেতন বললেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস, রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা কিংবা সোনাঝুড়ির খোয়াই হাট। কিন্তু আপনি কি জানেন, শান্তিনিকেতনের কোল ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এক ইতিহাসের সাক্ষী? বীরভূমের সুরুল গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন ‘সুরুল সরকার জমিদার বাড়ি’ এখন শান্তিনিকেতনগামী পর্যটকদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র। বিশাল সুসজ্জিত অট্টালিকার প্রতিটি ইটে জড়িয়ে থাকা সেই রাজকীয় ইতিহাস পর্যটকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে।
কীভাবে পৌঁছাবেন সুরুল জমিদার বাড়িতে?
-
রেলপথে: সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ হলো হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বোলপুর-শান্তিনিকেতন স্টেশনে নামা। স্টেশন থেকে সুরুল জমিদার বাড়ির দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। যে কোনো অটো বা টোটো রিজার্ভ করে সোজা পৌঁছে যাওয়া যায়। টোটো ভাড়া আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এছাড়া প্রান্তিক স্টেশনে নেমেও সোনাঝুড়ি হাট হয়ে (দূরত্ব প্রায় ৭ কিমি) যাওয়া সম্ভব।
-
সড়কপথে: কলকাতা থেকে গাড়িতে এলে বর্ধমান হয়ে ভেদিয়া অজয় নদের সেতু পেরিয়ে বোলপুর বাইপাস ধরে সরাসরি সুরুল পৌঁছানো যায়। বিকল্প পথ হিসেবে ইলামবাজার জঙ্গলের রাস্তা ধরে শ্রীনিকেতন মোড় হয়েও সুরুল গ্রামে যাওয়া যায়। জমিদার বাড়ির কাছেই চারচাকা ও বাইক পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবেশ মূল্য ও ছবি তোলার কড়া নিয়মাবলী: সুরুল সরকার জমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য মাথাপিছু টিকিট মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫ টাকা। পর্যটকরা চাইলে নিজেদের মোবাইল ফোনে ছবি, ভিডিয়ো কিংবা নিজস্বী (Selfie) তুলতে পারেন। তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো প্রফেশনাল শ্যুট, ইউটিউব ভিডিও কিংবা রিলস (Reels) বানানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিয়ম অমান্য করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়।
৩০০ বছরের ইতিহাস ও রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র: সুরুল সরকার জমিদার বাড়ির ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। বর্ধমানের ছোট নীলপুর গ্রাম থেকে ভরতচন্দ্র ঘোষ সুরুল গ্রামে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘সরকার’ পদবি দেয়। বর্ধমানের রাজার কাছ থেকে দুটি জমিদারির লাট কিনে তিনি এখানে জমিদারি শুরু করেছিলেন।
পরবর্তীতে ভরতচন্দ্র ঘোষের পুত্র কৃষ্ণহরি সরকার আজ থেকে প্রায় ২৯২ বছর আগে জমিদার বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। প্রথমে মাটির আটচালা মণ্ডপ থাকলেও পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বৃহদাকার কংক্রিটের অট্টালিকা ও সুসজ্জিত নাটমন্দির নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১২৯ বছর আগে ভাইদের মধ্যে বিভাজন হলে ছোট বাড়ির পুজো আলাদাভাবে শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সাথেও এই সুরুল সরকার বাড়ির একসময় নিবিড় যোগাযোগ ছিল।
কী কী দেখবেন এবং দুর্গাপুজোর বিশেষ আকর্ষণ: সুরুল জমিদার বাড়ির অন্দরে পা রাখলেই চোখে পড়বে শতবর্ষ প্রাচীন বিশাল থাম, কারুকার্যময় নাটমন্দির, কড়ি কাঠের ছাদ, পুরনো কাঠের দরজা-জানলা, দ্বিতলের বারান্দা এবং সিংহদুয়ার।
দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে এই জমিদার বাড়ি যেন আলোর রোশনাইয়ে অন্য রূপ ধারণ করে:
-
রেড়ির তেলের বেলজিয়াম ঝাড়বাতি: পুজোর দিনগুলিতে সম্পূর্ণ মণ্ডপ ও নাটমন্দির সাজানো হয় শতাব্দী প্রাচীন বেলজিয়াম কাঁচের ঝাড়বাতি দিয়ে। এই ঝাড়বাতিগুলি বিদ্যুৎ দিয়ে নয়, প্রথা মেনে আজও রেড়ির তেল দিয়ে প্রজ্বলিত করা হয়!
-
হাতে তৈরি প্রতিমা ও অলঙ্কার: বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করে আসছেন নির্দিষ্ট মৃৎশিল্পীরা। প্রতিমার মুখমণ্ডল কোনো ছাঁচে নয়, হাতে তৈরি হয় এবং চালচিত্রটিও হাতে আঁকা। দেবীপ্রতিমাকে সাজানো হয় প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন অলঙ্কার দিয়ে।
পুজোর দিনগুলিতে আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে থাকা পরিবারটির সদস্যরা একত্রিত হন এবং সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় রাজবাড়ির বিশাল সিংহদুয়ার।
তাই এবার শান্তিনিকেতন সফরের তালিকায় বিশ্বভারতী, কোপাই নদী, সৃজনী শিল্পগ্রাম ও আমার কুটিরের পাশাপাশি ইতিহাস আর বনেদিয়ানায় ঘেরা প্রাচীন এই সুরুল সরকার জমিদার বাড়িকে যুক্ত করতে ভুলবেন না!
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: মূল সংবাদের মাঝে থাকা ছবি সংক্রান্ত বন্ধনীযুক্ত সংকেতগুলি পেশাদার সংবাদ সম্পাদনার নিয়ম মেনে মূল কন্টেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।)