‘আমি চীনা, তুর্কি নই!’ উইঘুর তরুণীর এক মন্তব্যে শুরু অনলাইন মহাযুদ্ধ, জিনজিয়াং নিয়ে মুখোমুখি চীন ও তুরস্ক!

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিনজিয়াং (Xinjiang) প্রদেশ এবং সেখানকার উইঘুর (Uyghur) মুসলিমদের পরিচয় ও ইতিহাস ঘিরে চীন ও তুরস্কের নেটিজেনদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। একটি মাত্র সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক বর্তমানে উভয় দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক অধিকার এবং পাঠ্যপুস্তকের নাম পরিবর্তন পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে বিবাদের সূত্রপাত
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (SCMP)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের এক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী শিনজিয়াং ভ্রমণের সময় এক উইঘুর তরুণীর সঙ্গে তাঁর কথোপকথন শেয়ার করেন। ওই তুর্কি ব্যবহারকারী তরুণীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি নিজেকে ‘তুর্কিক’ (Turkic) মনে করেন কি না। জবাবে ওই তরুণী স্পষ্ট জানান, “না, আমি চীনা।” এরপর ওই তুর্কি ব্যবহারকারী তাঁকে ‘নিজের আসল শেকড়ে’ ফিরে আসার পরামর্শ দেন।
পোস্টটি তুর্কি ও চীনা নেটিজেনদের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০ লাখেরও বেশি ভিউ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলা হয়। তবে বিতর্ক থামেনি; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নির্ভর ভাষা রূপান্তরকারী (Translation Tool) ব্যবহার করে দুই দেশের নেটিজেনরা উইঘুরদের আসল জাত্যাভিমান ও শিনজিয়াংয়ের ইতিহাস নিয়ে তীব্র তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘তুর্কিস্তান’ ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন
এই বিতর্কের মূল রসদ জুগিয়েছে ঐতিহাসিক ‘তুর্কিস্তান’ শব্দটি। মধ্য এশিয়ার যে সমস্ত অঞ্চলে তুর্কি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ বাস করতেন, ঐতিহাসিকভাবে সেই অঞ্চলকে ‘তুর্কিস্তান’ বলা হতো। সম্প্রতি তুরস্ক তাদের স্কুলের নতুন পাঠ্যপুস্তকে ‘মধ্য এশিয়া’ শব্দের পরিবর্তে ‘তুর্কিস্তান’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, ওই পাঠ্যবইয়ে প্রদর্শিত ভৌগোলিক মানচিত্রে চীনের শিনজিয়াংয়ের কিছু অংশের পাশাপাশি Gansu এবং Qinghai প্রদেশের মতো এলাকাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে।
তুরস্কের এই পদক্ষেপকে চীন নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের স্পষ্ট বক্তব্য— ভাষা বা সংস্কৃতির মিল থাকলেই কোনো এলাকাকে অন্য দেশের সঙ্গে জড়িয়ে দাবি করা যায় না।
উইঘুর ইস্যু ও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
উল্লেখ্য, শিনজিয়াং প্রদেশে প্রায় ১.২ কোটি উইঘুর মুসলিম বসবাস করেন, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি তুর্কিদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তুরস্ক হলো মধ্য এশিয়ার বাইরে উইঘুর প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। দীর্ঘদিন ধরেই তুরস্ক শিনজিয়াংয়ে সংখ্যালঘু মুসলিমদের মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার। অন্যদিকে, চীনের দাবি— শিনজিয়াংয়ে তাদের কড়া পদক্ষেপ কেবল সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থা দমনের জন্য।
তবে এত মতপার্থক্য সত্ত্বেও বেইজিং ও আঙ্কারার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেশ মজবুত হয়েছে। ২০২৪ সালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শিনজিয়াং সফর করে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে যৌথ সম্মতির কথা জানিয়ে এসেছিলেন। এ ছাড়া সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সামিটেও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেজেপ তায়িপ এরদোয়ানের মধ্যে ইতিবাচক বৈঠক হয়।
তবুও, শিনজিয়াং এবং উইঘুরদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের এই অনলাইন সংঘাত উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল।