রান্নাঘরের কাজই ডেকে আনছে বড় বিপদ? দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্নার অভ্যাসে কি হচ্ছে আর্থ্রাইটিস?

সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে কেটে যাওয়া বেশিরভাগ ভারতীয় গৃহিণীর দৈনন্দিন রুটিনের অঙ্গ। ব্রেকফাস্ট তৈরি, দুপুরের ভারী রান্না, বিকেলের টিফিন থেকে শুরু করে রাতের ডিনারের জোগাড়—টানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা রান্নাঘরের শক্ত মেজেতে দাঁড়িয়ে কাজ করাটা অত্যন্ত সাধারণ একটি ছবি। আর এই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার ঠিক পরেই শুরু হয় হাঁটুতে খচখচে ও তিরতিরে ব্যথা, কোমরে অসম্ভব টান কিংবা গোড়ালি ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা। এই ধরনের শারীরিক অস্বস্তি দেখা দেওয়া মাত্রই অনেকের মনেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে যে, এত কষ্টের জেরে কি শেষ পর্যন্ত তাঁদের আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা বাসা বাঁধল শরীরে?

এই অত্যন্ত সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিশিষ্ট অর্থোপেডিক চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন যে, শুধুমাত্র দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার ফলেই সরাসরি আর্থ্রাইটিস বা বাতের রোগ হয় না। আর্থ্রাইটিস মূলত একটি জটিল ও বহুমুখী শারীরিক সমস্যা। এর নেপথ্যে প্রধানত বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জয়েন্টের কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ক্ষয়ে যাওয়া, জিনের বা বংশগত সমস্যা, শরীরের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, হরমোনের তারতম্য, অতীতে কোনো বড় চোট পাওয়া কিংবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগ দায়ী থাকে। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন যে, একটানা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার অভ্যাস এই অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটিকে অনেক বেশি দ্রুততর করে তোলে এবং সুপ্ত অবস্থাতাকে বাইরে নিয়ে আসে।

টানা দাঁড়িয়ে থাকার ফলে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি হয় শরীরের? চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যখন কেউ দীর্ঘক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তখন দেহের পুরো অতিরিক্ত ওজন গিয়ে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে হাঁটু, কোমর এবং গোড়ালের সংবেদনশীল জয়েন্টগুলির ওপর। এই নিরন্তর চাপের ফলে জয়েন্টের দুই হাড়ের মাঝে কুশনের মতো কাজ করা কার্টিলেজ দ্রুত ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। কার্টিলেজ সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গেলে হাড়ের সঙ্গে হাড়ের প্রত্যক্ষ ঘষা লাগে, আর তখনই জন্ম নেয় অস্টিওআর্থ্রাইটিসের তীব্র যন্ত্রণা। বিশেষ করে যাদের বয়স চল্লিশের গণ্ডী পেরিয়ে গিয়েছে, যাদের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কিংবা যাদের পারিবারিক পরিবারে আর্থ্রাইটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা সাধারণ মানুষের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি থাকে। এছাড়া রান্না করার সময় ভুল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কাজ করলে কোমরের ডিস্ক বা হাড়ের ওপর প্রচণ্ড অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে বড় কোনো স্পাইনাল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

এই মারাত্মক ঝুঁকি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু অত্যন্ত কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, রান্নাঘরে কাজের সময় ‘৩০-৫ মিনিটের নিয়ম’ কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। কখনোই টানা ত্রিশ মিনিটের বেশি দাঁড়িয়ে কাজ করা একদমই ঠিক নয়। রান্নাঘরের এক কোণে একটি উঁচু টুল বা আরামদায়ক চেয়ার রাখা যেতে পারে। একটানা ত্রিশ মিনিট দাঁড়িয়ে কাজ করার পর অন্তত পাঁচ মিনিট বসে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। সবজি কাটা, মশলা বাটার মতো প্রাথমিক বা ভারী কাজগুলি সবসময় বসে করার অভ্যাস করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রান্নার সময় মেঝেতে ‘অ্যান্টি-ফ্যাটিগ ম্যাট’ বা বিশেষ ফোমের নরম মাদুর ব্যবহার করা অত্যন্ত ফলদায়ক। খালি শক্ত মার্বেল বা টাইলসের মেঝেতে দাঁড়ালে জয়েন্টে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ধাক্কা ও চাপ লাগে। বাজারে এখন নরম ফোমের তৈরি এই ধরনের কিচেন ম্যাট কিনতে পাওয়া যায়, যা পায়ের নিচে জালের মতো কুশনের কাজ করে এবং হাঁটু ও কোমরের ওপর পড়া শরীরের চাপ প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, কখনই রান্নাঘরে খালি পায়ে বা পাতলা হাওয়াই চপ্পল পরে দাঁড়ানো উচিত নয়। এর পরিবর্তে সবসময় নরম সোলের, হালকা উঁচু সাপোর্টওয়ালা আরামদায়ক স্লিপার পায়ে গলিয়ে নেওয়া দরকার, যা গোড়ালি ও হাঁটুকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট জোগায়।

চতুর্থত, শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত ওজন মানেই হাঁটু ও কোমরের জয়েন্টের ওপর বাড়তি বোঝাপড়া। এছাড়া রান্নার সময় কখনোই কুঁজো হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়, বরং সবসময় সোজা হয়ে কাজ করা বাঞ্ছনীয়। খেয়াল রাখতে হবে রান্না করার স্ল্যাব বা প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা যেন কোমর পর্যন্ত হয়, যাতে কাজ করার সময় অকারণে কোমর ঝুঁকিয়ে অতিরিক্ত চাপ না ফেলতে হয়। পঞ্চমথ, প্রতিদিন সকালে মাত্র দশ মিনিট সময় বের করে হাঁটুর জন্য কিছু হালকা স্ট্রেচিং করা উচিত। যেমন—পা সোজা করে টানটান করা, গোড়ালি গোল করে ঘোরানো এবং হালকা স্কোয়াট করা। এই সহজ ব্যায়ামগুলি জয়েন্টের চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তপোক্ত করে তোলে।

তবে এত সতর্কতা সত্ত্বেও যদি দেখা যায় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হাঁটু বা আঙুলের জয়েন্টগুলি শক্ত হয়ে আটকে থাকছে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময় হাঁটু থেকে কটকট শব্দ আসছে, জয়েন্ট ফুলে উঠছে কিংবা ব্যথা একটানা তিন থেকে চার দিনের বেশি স্থায়ী হচ্ছে, তবে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সামান্য অবহেলা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *