“শত শত কারখানা বন্ধ, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি!”-বাংলাদেশ ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে?

ঢাকার মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকাগুলির অন্যতম নিউ ইস্কাটন রোড। সকালে এই রাস্তা ধরে অনেকেই শহরের অন্যতম বড় পার্ক রমনায় হাঁটতে যান। ফেরার পথে তাঁদের হাতে দেখা যায় সবজির থলি। রাস্তার ধারে সাইকেল ভ্যানে করে যে সবজি বিক্রি হয়, সেখান থেকেই তাঁরা কেনেন। আশপাশের বাসিন্দারাও এই ভ্যানগুলির সামনে ভিড় করেন। ঢাকার বড় পাইকারি সবজির বাজার কারওয়ান বাজার এখান থেকে মাত্র আধ কিলোমিটার দূরে। ফলে এই বিক্রেতারা খুব সহজেই পাইকারি বাজার থেকে টাটকা সবজি নিয়ে আসতে পারেন। পরিবহণ খরচও কম হওয়ায় তুলনামূলক কম দামে সবজি বিক্রি করা সম্ভব হয়।
তলানিতে ঠেকেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মূলধন
আগে যেখানে চার কেজি পটল আনতেন, এখন ভ্যানচালক আনেন মাত্র দুই কেজি। ষাটের কোঠা পেরোনো এক সবজি বিক্রেতাকে জিগ্গেস করেছিলাম, তিনি কেন আগের তুলনায় কম সবজি আনছেন। তাঁর উত্তর, “সবজির দাম বেড়েছে, কিন্তু ব্যবসার মূলধন বাড়েনি। উল্টে মূলধনের একটা অংশ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে।”
কেন মূলধন কমে গেল, জানতে চাইতেই তিনি কিছুটা বিরكت হয়ে বলেন, “সবজির দাম বাড়লে মানুষ তো এক কেজির বদলে ৫০০ গ্রাম বা ৪০০ গ্রাম কেনে। কম বিক্রি হলে লাভ বেশি হয়, না কম?” কেবল সবজি নয়, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল—সবকিছুর চড়া দাম ছোট ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করে দিয়েছে। সরকার সম্প্রতি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা কিনতে হচ্ছে আরও চড়া দামে। গ্রামাঞ্চলেও ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ
বাস্তবে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে পণ্যসামগ্রীর সামগ্রিক মূল্যস্তর বেড়েছে ১৫ শতাংশ। অথচ ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সরকারি হিসাবের মধ্যে এক ধরনের পরিসংখ্যানগত কারসাজি রয়েছে। কাগজে-কলমে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্তর ৭ থেকে ৮ শতাংশ বাড়লেও, গত দুই বছরে প্রকৃত খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ!
মানুষের কেনাকাটা কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত দেশের অন্তত ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে জড়িত সাব-কন্ট্রাক্টর ও সহযোগী হাজার হাজার কারখানা বন্ধ থাকায় প্রকৃত বেকারত্বের হার সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
কর্পোরেট চাকরিহারাদের সংকট ও ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’
সাধারণ দিনমজুর রিকশা চালিয়ে বা দিনমজুরি করে কোনোমতে পেটের ভাত জোগাড় করতে পারলেও, চাকরি হারানো কর্পোরেট এগজিকিউটিভদের অবস্থা আরও শোচনীয়। কোম্পানির গাড়ি, যাতায়াত খরচ ও ফোনের বিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সংসারের বাজেট পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
অভিজাত এলাকাগুলিতে দিনমজুর বা ড্রাইভারদের দু’বেলার রাস্তার ধারের খাবারের মাসিক খরচ ৩,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬,০০০ টাকা। অথচ মাসিক ১০-১২ হাজার টাকা আয়ের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী এর জেরে পরিবারকে খাওয়ানোর মতো অর্থটুকুও আর বাঁচাতে পারছেন না। কেউ কেউ দিনে মাত্র এক বার খেয়ে কিংবা কলা, বিস্কুট ও চা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যের অভাবে সরাসরি মৃত্যু না হলেও, এই তীব্র বঞ্চনা ও অপুষ্টি আসলে এক ধরনের ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’-এর লক্ষণ।
আইএমএফের শর্ত এবং জ্বালানি-ডলার সংকট
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আইএমএফ-এর বাজেট সহায়তার কোনো কিস্তি পায়নি, কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, ভর্তুকি বন্ধ করা এবং ব্যাংকিং সংস্কারের মতো শর্তগুলি অত্যন্ত কঠোর। এর জেরে ডলার সংকট মোকাবিলায় সরকার কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে দেওয়ায় গত সাত মাসে রেকর্ড তিনবার বাড়াতে হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম।
ব্যাংকিং খাতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। দেশীয় উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থান থমকে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়লে তা পুরো অর্থনীতিকে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।