দামি গাড়ি কেনার স্বপ্ন বিসর্জন, আড়াই কোটির বদলে কৃষকদের জীবন বাঁচানোই ছিল যাঁর ব্রত! প্রয়াত কিংবদন্তি নানা পাটেকর

রুপালি পর্দার শক্তিশালী অভিনয় আর অনন্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখা কিংবদন্তি ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা নানা পাটেকর আর আমাদের মাঝে নেই। ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই মহান শিল্পী। বৃহস্পতিবার সকালে গোয়ায় তাঁর নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন তিনি। এরপর তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁর প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও শেষরক্ষা হয়নি। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর পুত্র মালহার পাটেকর।

বিশ্ববাসীর কাছে তিনি ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘আব তক ছাপ্পান’ কিংবা ‘নাটসম্রাট’-এর মতো একাধিক স্মরণীয় চলচ্চিত্রের অতুলনীয় অভিনেতা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, কিন্তু তাঁর জীবনের প্রকৃত ও শ্রেষ্ঠ অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল ক্যামেরার আলোর অনেক দূরে, সাধারণ মানুষের দুখে-সুখে। এক সেলিব্রিটি তারকার গ্ল্যামার ঝেড়ে ফেলে হাজার হাজার অসহায় কৃষকের পরম আপন ও ত্রাতা হয়ে ওঠার সেই রূপকথার মতো গল্পটি আজ রূপ নিয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতায়।

একটি মাত্র টিভি স্ক্রিন বদলে দিয়েছিল জীবনের গতিপথ:
সালটা ২০১৫। এক সাধারণ সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে আরামে বসেছিলেন নানা পাটেকর। হাতে পানীয়ের গ্লাস আর সামনে চলছে টেলিভিশন। চলচ্চিত্রে দশকের পর দশক কঠোর পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থ থেকে তখন তাঁর জমানো ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা। সেই জমানো টাকায় নিজের জন্য একটি চোখধাঁধানো নতুন বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে, ঠিক যতক্ষণ না টিভির পর্দায় ব্রেকিং নিউজ হিসেবে মহারাষ্ট্রের এক খরা-কবলিত অঞ্চলের এক কৃষকের আত্মহত্যার মর্মান্তিক খবরটি ভেসে ওঠে।

পর্দায় ফুটে ওঠা কৃষকের ক্রন্দনরত পরিবারটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন নানা। সামনে বসে থাকা বিধবা স্ত্রী, অনাথ শিশুসন্তান আর পুত্রহারা বৃদ্ধ বাবা-মার কান্নার সেই দৃশ্য শুধু তাঁর হৃদয়কেই বিদীর্ণ করেনি, তাদের চোখের ক্ষুধার ছাপ তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আমরা আসলে কেন গাড়ি কিনছি?” পরবর্তীতে ২০২৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে নানা সেই সন্ধের কথা স্মরণ করে জানিয়েছিলেন, ওই একটি মাত্র টেলিভিশন প্রতিবেদন তাঁর জীবনের সমস্ত অগ্রাধিকার রাতারাতি বদলে দিয়েছিল। বিলাসবহুল গাড়ির জন্য জমানো দেড় কোটি টাকা সেদিনই এক সম্পূর্ণ নতুন ও মহৎ পথ খুঁজে পেয়েছিল।

বীডের সেই সফর যা পাল্টে দিয়েছিল সবকিছু:
টিভির সেই মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি অভিনেতা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোন করেন মারাঠওয়াড়ারই বাসিন্দা তথা সহ-অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরেকে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল আত্মহত্যা করা প্রতিটি কৃষকের পরিবারকে ১৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য পাঠানো হবে। কিন্তু মকরন্দ নানাকে শুধু টাকা না পাঠিয়ে সশরীরে বীডে (Beed) যাওয়ার পরামর্শ দেন। জোর দিয়ে বলেন, নিজে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করা প্রয়োজন।

বীডে পৌঁছে সেখানকার যে ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি হন নানা, তা তাঁকে স্তব্ধ করে দেয়। একটি জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন এমন মহিলা, খরা ও ঋণের দায়ে যাঁরা নিজেদের স্বামী হারিয়েছিলেন। কারও কোলে ক্ষুধার্ত শিশু, আবার কেউ মায়ের আঙুল ধরে দাঁড়িয়ে। সেই দৃশ্য নানার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেয়। তিনি তো গিয়েছিলেন কেবল অনুদান দিতে, কিন্তু ফেরার পথে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—একটি মাত্র আর্থিক সাহায্য কি সত্যিই এই পরিবারগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে পারে? তাঁর হৃদয়ে জন্ম নিল এক গভীর উপলব্ধি: “এই শিশুদের মধ্যে একজন যদি আমাদের নিজের সন্তান হতো, আমরা কী করতাম?” আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্যক্তিগত সাহায্য রূপ নেয় এক সুবৃহৎ সামাজিক মিশনে।

‘নাম ফাউন্ডেশন’ ও জল সংরক্ষণের রূপকথা:
কৃষক সঙ্কটের স্থায়ী মোকাবিলায় ২০১৫ সালে নানা পাটেকর এবং মকরন্দ আনাসপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (NAM Foundation)। মারাঠওয়াড়া ও বিদর্ভের ভয়াবহ খরা এবং গ্রামীণ সংকট দূর করতে ময়দানে নামে এই সংস্থা। প্রাথমিকভাবে সরাসরি আর্থিক সাহায্য করা হলেও নানা শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অসম্ভব। কৃষকদের এই চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়া থেকে আটকাতে হবে।

সংস্থাটি উপলব্ধি করল, এই সংকটের মূল শিকড় লুকিয়ে রয়েছে জলের তীব্র অভাবে। জল না থাকলে ফসল শুকিয়ে যাবে, ফসল না ফললে আয় কমবে, আর আয় না থাকলে কৃষকরা বাধ্য হবেন চরম পথ বেছে নিতে। এরপরই ‘নাম ফাউন্ডেশন’ জল সংরক্ষণকে তাদের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়। নদী, ঝর্ণা, খাল, ভূগর্ভস্থ জল শোধনাগার এবং কৃষি পুকুর গভীর ও পরিষ্কার করার বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেয় তারা। যার ফলে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ জলের স্তর উন্নত হয়, তেমনই বাড়ে ফসলের ফলন। পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন, শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা এবং বিকল্প আয়ের উৎস তৈরিতেও অসামান্য অবদান রাখে এই সংস্থা।

এই মহৎ উদ্যোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পেয়েছিলেন নানা। যখনই নাম ফাউন্ডেশন কোনো ত্রাণ বা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে, সমাজের অতি ধনী ব্যক্তিদের চেয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষই তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ উজাড় করে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা করোনা মহামারীর কঠিন সময়েও এই সংস্থার ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে গেছে লাখো মানুষের ঘরে। এছাড়া ‘নির্মলা গজানন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমেও নীরবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে গেছেন এই মহানুভব অভিনেতা।

সিনেমা এবং বাস্তব জীবনের এক অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক:
পর্দার পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য কেরিয়ারে নানা পাটেকর তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান ভূষিত করেছে। কিন্তু রুপালি পর্দার বাইরেও তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা এবং দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ।

কৃষকদের পাশাপাশি ভারতীয় জওয়ানদের সঙ্গেও নানার ছিল এক গভীর আত্মিক টান। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখ সমরে সরাসরি ভারতীয় সেনা জওয়ানদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘প্রহর’ চলচ্চিত্রের জন্য আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুবাদে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর এই নিবিড় যোগাযোগ যুদ্ধের কঠিন সময়েও জওয়ানদের অসীম উৎসাহ জুগিয়েছিল।

নানা পাটেকরের প্রয়াণ কেবল একজন কিংবদন্তী অভিনেতার চিরবিদায় নয়। তিনি ছিলেন এমন এক বিরল মানুষ, যিনি হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের শখের দেড় কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি কেনার স্বপ্নকেও এক নিমিষে ত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি। টেলিভিশনের একটি সাধারণ সংবাদ থেকে শুরু হওয়া তাঁর সেই মানবকল্যাণের যাত্রা আগামী দিনেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার এক অমর জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *