মুখের ভেতরে কামড় লাগলে চিনি দিতে বলেন কেন বড়রা? এই ঘরোয়া টোটকা কি আদৌ নিরাপদ?

খাওয়ার টেবিলে বা কথা বলতে বলতে অসাবধানতাবশত জিভ বা গালের ভেতরের নরম অংশে নিজেরই দাঁতের তীব্র কামড় লাগেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কামড় লাগার সাথে সাথেই মুখে এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মা-ঠাকুমারা কিংবা বয়স্করা সাথে সাথে এক চিমটি চিনি বা গুড় মুখে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ক্ষতের ওপর সরাসরি চিনি দিলে কেন যন্ত্রণার উপশম হয় বা রক্ত পড়া বন্ধ হয়? নাকি চিনি দেওয়া কেবলই এক বহুল প্রচলিত কুসংস্কার?
মুখে কামড় পড়লে কেন চিনি দিতে বলা হয়? (পেছনের বিজ্ঞান)
ক্ষতস্থানে চিনি প্রয়োগের ঘটনাটি কেবল লোককথা নয়, এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক কারণ:
-
অসমোসিস (Osmosis) ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস: চিনি বা সুক্রোজের প্রধান গুণ হলো এটি আর্দ্রতা শুষে নেয়। যখন ক্ষতের ওপর ঘন চিনি চেপে রাখা হয়, তখন অসমোসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিনি ক্ষতস্থানের সমস্ত জল বা আর্দ্রতা শুষে নেয়। ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর জীবাণু বেঁচে থাকার জন্য জলের প্রয়োজন। আর্দ্রতা হারিয়ে গেলে ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় এবং জায়গাটি প্রাকৃতিক উপায়ে জীবাণুমুক্ত হতে শুরু করে।
-
এন্ডোরফিন হরমোন ক্ষরণ ও যন্ত্রণা হ্রাস: মুখে চিনি দিলে জিভের মিষ্টি স্বাদগ্রহণকারী সংবেদনশীল স্নায়ুগুলো সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কে হঠাৎ মিষ্টির অনুভূতির সংকেত পৌঁছালে ব্রেন ‘এন্ডোরফিন’ নামক এক ধরণের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হরমোন নিঃসরিত করে, যা কামড়ের তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতিকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়।
-
রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করা: ক্ষতস্থানে দানা দানা চিনি চেপে রাখলে তা সাময়িকভাবে রক্তনালীর মুখের ওপর প্রলেপ বা ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার তৈরি করে। এর ফলে তরল রক্তের গতি কিছুটা কমে এবং লালার সংমিশ্রণে তা রক্ত জমাট বাঁধতে (Blood Clotting) সাহায্য করে।
মুখের ক্ষতে চিনি ব্যবহার কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ডেন্টাল সার্জনদের মতে, এটি একটি সাময়িক ও প্রাকৃতিক প্রাথমিক চিকিৎসা (First-Aid) হিসেবে কাজ করলেও এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন নয়। মুখে দীর্ঘক্ষণ চিনি বা মিষ্টি জাতীয় পদার্থ জমিয়ে রাখলে দাঁতের ফাঁকে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্রুত অম্ল বা অ্যাসিড তৈরি করে। এর ফলে পরবর্তীতে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে ‘ক্যাভিটি’ বা ডেন্টাল ক্যারিজের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
চিনির পরিবর্তে কিছু নিরাপদ বিকল্প:
১. বরফ বা ঠান্ডা জল: একটি বরফের টুকরো পরিষ্কার কাপড়ে পেঁচিয়ে ক্ষতের জায়গায় চেপে রাখুন। এর ঠান্ডা ভাব রক্তনালীকে সংকুচিত করে দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করে এবং ফোলা ভাব ও যন্ত্রণা কমায়।
২. হালকা নুন-জলের কুলকুচি: এক গ্লাস ইষদুষ্ণ জলে সামান্য নুন মিশিয়ে কুলকুচি করুন। নুন প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে কাজ করে মুখের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।
৩. খাঁটি মধু: চিনির চেয়েও ক্ষত নিরাময়ে মধু অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। মধুতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই মুখের ভেতরের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তোলে।
তবে ক্ষত যদি খুব গভীর হয়, দু-তিন দিনের মধ্যেও যদি ঘা না শুকায় বা অনবরত রক্তপাত হতে থাকে, তবে ঘরোয়া টোটকার ওপর ভরসা না করে অবিলম্বে একজন দন্ত চিকিৎসকের (Dentist) পরামর্শ নেওয়া উচিত।