সোনার পাহাড় থেকে কোটি কোটি নগদ টাকা! সিআইএ-র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভুয়ো কেলেঙ্কারি ফাঁস

আমেরিকান রহস্য ও রোমাঞ্চকর সব গোপন মিশনের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র। কিন্তু সেই হাই-প্রোফাইল সংস্থারই এক শীর্ষকর্তা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যেভাবে বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার মহা দুর্নীতি চালিয়ে গিয়েছেন, তা দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছেন স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরাও!

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার অ্যাশবার্নে সিআইএ-র প্রাক্তন শীর্ষ আধিকারিক ড্যানিয়েল জে. রাশ (৪৯)-এর বিলাসবহুল বাসভবনে এফবিআই-এর বিশেষ অভিযানের পর উদ্ধার হয়েছে সোনার পাহাড়, বান্ডিল বান্ডিল নগদ ডলার এবং বিরল সব সংগ্রাহক ঘড়ি। মঙ্গলবার মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির হয়ে নিজের অপকর্ম ও ‘ওয়্যার ফ্রড’ (Wire Fraud)-এর সমস্ত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন ওই প্রাক্তন সিআইএ কর্তা।

কাল্পনিক ‘গোপন মিশন’ বানিয়ে ১৮,৮০০ কোটির তছরুপ!
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, ৪৯ বছর বয়সী ড্যানিয়েল রাশ সিআইএ-র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ‘ডাইরেক্টরেট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-র সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে আসীন ছিলেন। ফলে তাঁর কাছে ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অতি-গোপনীয় তথ্য ও প্রকল্প অনুমোদন করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘টপ সিক্রেট সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স’।

এই শীর্ষ ক্ষমতারই চরম অপব্যবহার করেন তিনি। একের পর এক কাল্পনিক ও মনগড়া সিআইএ প্রকল্পের জন্ম দেন রাশ। কাগজে-কলমে তিনি দেখাতেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে অত্যন্ত গোপনীয় মিশন চালানো হচ্ছে, যার জন্য বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, বিদেশি মুদ্রা এবং সোনা কেনা অতি জরুরি। যেহেতু প্রকল্পগুলি অতি-গোপনীয় ক্যাটাগরির ছিল, তাই সংস্থার ভেতরের আধিকারিকরাও তা সহজে যাচাই করার সুযোগ পাননি। এভাবে ভুয়ো প্রকল্পের অজুহাত দেখিয়ে তিনি সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১৯৪ কোটি মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮,৮০০ কোটি টাকা) আত্মসাৎ করার ছক কষেছিলেন।

সিআইএ কর্তার বাড়িতে এফবিআই তল্লাশি: উদ্ধার যা হলো
আবাসিক বাসভবনের ভেতরেই যেন গড়ে তোলা হয়েছিল এক বিশাল ধনকুবেরের গোপন ভল্ট! অভিযান চালিয়ে এফবিআই যে সমস্ত জিনিস বাজেয়াপ্ত করেছে:

৩১৭ কেজি খাঁটি সোনা: রাশ-এর বাড়ি থেকে মোট ৩০০টি খাঁটি সোনার বার উদ্ধার করা হয়, যার মোট ওজন প্রায় ৭০০ পাউন্ড (৩১৭ কেজি)। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য ৪ কোটি ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

নগদ অর্থের পাহাড়: গোপন ভল্টে লুকিয়ে রাখা ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ২ কোটি টাকা) নগদ অর্থ উদ্ধার হয়েছে।

বিলাসবহুল ঘড়ি: বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের ৩৫টি অত্যন্ত মূল্যবান ও দুর্লভ সংগ্রাহক সংস্করণের ঘড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কীভাবে ফাঁস হলো দুর্নীতি?
সিআইএ-র ডাইরেক্টরেট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বার্ষিক হিসাব নিরীক্ষার সময় রাশের তৈরি কিছু প্রকল্পের খরচ নিয়ে প্রথম সন্দেহ তৈরি হয়। সিআইএ-র অভ্যন্তরীণ তদন্তকারী দল যখনই গোপন ফাইলগুলি পরীক্ষা করা শুরু করে, তখনই জানা যায় যে রাশের খাতায়-কলমে উল্লেখ করা মিশনগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই!

এরপরই বিষয়টি মার্কিন বিচার বিভাগ এবং এফবিআই-কে হস্তান্তর করা হয়। ফ্লোরিডায় কেনা একাধিক মূল্যবান সম্পত্তি এবং সমস্ত সোনা ও গাড়ি ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

হতে পারে ২০ বছরের জেল
এই নজিরবিহীন ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সিআইএ প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ এক বিবৃতিতে বলেন, “ড্যানিয়েল রাশ কেবল আর্থিক অপরাধ করেননি, তিনি মার্কিন জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে চরম প্রতারণা করেছেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে যাঁরা আখের গোছায়, তাঁদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।”

আইন অনুযায়ী, ওয়্যার ফ্রডের অভিযোগে অপরাধ প্রমাণিত হলে ড্যানিয়েল রাশের সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। রাষ্ট্রের এত বড় অংকের অর্থ তছরুপের কারণে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী জেল হওয়া কার্যত নিশ্চিত বলে মনে করছেন আইনি বিশ্লেষকরা।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *