স্বাধীনতার ৮০ বছর পর ইতিহাস! ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে বাংলাদেশ পাড়ি দিল আসামের প্রথম আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজ

স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছর পর আসামের ডিব্রুগড় থেকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কার্গো বা পণ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বोगीবীল (Bogibeel) টার্মিনাল থেকে এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা করেন। এই অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। এই বিশেষ কার্গোতে মোট ১,০৮০ টন মেথানল রয়েছে, যা আসাম পেট্রো-কেমিকেলস লিমিটেড (APCL) দ্বারা প্রস্তুত করা হয়েছে। দুটি জাহাজে মোট ৫৪টি আইএসও (ISO) ট্যাঙ্ক কন্টেইনার রয়েছে এবং প্রতি কন্টেইনারে প্রায় ২০ টন মেথানল বহন করা হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র থেকে সোজা ঢাকা: জলপথের রুট
বोगीবীল থেকে রওনা দিয়ে এই কার্গো ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র নদের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। এরপর জাহাজ দুটি ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং সরাসরি ঢাকার পंगाওস (Pangaon) বন্দরে গিয়ে পৌঁছবে। ডিব্রুগড়ের বोगीবীল থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত জলপথের দূরত্ব প্রায় ৭৮৩ কিলোমিটার, যা অতিক্রম করতে আনুমানিক সাত দিন সময় লাগবে। এর ফলে এবার থেকে সড়ক বা রেলপথের পাশাপাশি নদীর পথেই সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছানোর নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।

৩০ বছর ধরে বাতিল পড়ে থাকা জাহাজেই এল সাফল্য
এই পুরো যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষক দিক হলো যে দুটি জাহাজে করে এই মেথানল পাঠানো হচ্ছে, সেগুলি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত ছিল। আসাম সরকারের অভ্যন্তরীণ জল পরিবহন বিভাগের এই জাহাজগুলি প্রায় তিন দশক ধরে কোনো কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছিল না। পরবর্তীতে এপিএলসি (APCL) সেগুলি লিজ নিয়ে গুয়াহাটির পাণ্ডুতে সারাই করে পুনরায় বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। আজ সেই পুরনো জাহাজগুলির হাত ধরেই ব্রহ্মপুত্রে নতুন ইতিহাস রচিত হলো।

বोगीবীল টার্মিনালের প্রথম বড় পরীক্ষা ও উত্তর-পূর্বের বাণিজ্য সম্ভাবনা
এই যাত্রার মধ্য দিয়ে বोगीবীল নদীর ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট টার্মিনালটি তার প্রথম বড় বাণিজ্যিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হলো। এই টার্মিনালে কার্গো জেটি, ওয়্যারহাউস এবং কাস্টমস সংক্রান্ত সমস্ত আধুনিক সুবিধাই উপলব্ধ রয়েছে। কেন্দ্র সরকারের লক্ষ্য, বोगीবীলকে শুধুমাত্র স্থানীয় পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার এক প্রধান জলপথ করিডোর হিসেবে গড়ে তোলা।

প্রাথমিকভাবে মেথানল পাঠানো হলেও ভবিষ্যতে এই রুটে পলিমার, পেট্রোলিয়াম পণ্য, কয়লা, চা, পাহাড়ি কৃষি পণ্য এবং আসামের জিআই (GI) ট্যাগ প্রাপ্ত বিভিন্ন সামগ্রী পাঠানো হবে। এর ফলে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের এক নতুন বিকল্প খুঁজে পাবেন।

ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার লড়াই
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ব্রহ্মপুত্র নদ ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবসার মূল জীবনরেখা। সে সময় ডিব্রুগড় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। চা, কাঠ সহ বিভিন্ন পণ্য এই জলপথ দিয়েই যাতায়াত করত। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সেই ঐতিহাসিক নদী যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় আট দশক পর আবারও সেই পুরনো সোনালী ঐতিহ্য ও জলপথের সংযোগকে আধুনিক রূপ দিয়ে নতুন করে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগ উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতিতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *