“আর নয় ভুয়ো ডাক্তার!”-নিয়োগের আগেই নথি যাচাই বাধ্যতামূলক, কড়া নির্দেশ হাইকোর্টের

ভুয়ো চিকিৎসক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যজুড়ে চলা তীব্র বিতর্কের আবহে এবার অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ করল স্বাস্থ্য দপ্তর। বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং ক্লিনিকগুলিতে চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের রেজিস্ট্রেশন এবং যোগ্যতার সমস্ত নথি যাচাই করা এখন থেকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হলো। স্বাস্থ্য অধিকর্তা স্বপন সরেনের জারি করা নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বৈধ রেজিস্ট্রেশন বা চিকিৎসা করার যোগ্যতা চার দফায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তিকে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করা বা তাঁকে দিয়ে প্রেসক্রাইব করানো যাবে না।
৪ দফায় নথি যাচাইয়ের কড়া নির্দেশ
সমস্ত জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (CMOH) এবং বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, চিকিৎসক নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় শংসাপত্র খতিয়ে দেখতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইনের সংশ্লিষ্ট বিধি মেনেই এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরিচয় বা যোগ্যতা নিয়ে ন্যূনতম কোনো সন্দেহ তৈরি হলে, তা অবিলম্বে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই আকস্মিক কড়াকড়ি?
স্বাস্থ্য দপ্তরের এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের গত ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি নির্দেশ। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সুজিত বিশ্বাস নামক এক ব্যক্তির করা রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। মূলত সাধারণ রোগীরা যাতে কোনোভাবেই ভুয়ো বা অননুমোদিত চিকিৎসকদের খপ্পরে পড়ে ভুল চিকিৎসার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতেই আদালতের নির্দেশে এই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অবৈধভাবে চিকিৎসা পরিষেবা চালানোর বিরুদ্ধে নজরদারি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে দপ্তর। বৈধ রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কেউ চিকিৎসক পরিচয়ে প্র্যাকটিস করলে তাঁকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সেই রিপোর্ট স্বাস্থ্য দপ্তরকে পাঠাতে হবে।
স্বাগত জানিয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল সংগঠন
স্বাস্থ্য দপ্তরের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে ইতিমধ্যেই স্বাগত জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম। সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে জানিয়েছেন, তাঁরা সবসময় নৈতিক চিকিৎসা-চর্চা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই নিয়ম বাস্তবায়নে সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তবে একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল ও তার পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়ো চিকিৎসক-কাণ্ডের একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তেরও দাবি তুলেছে সংগঠন, যাতে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করা যায়।
পটভূমি ও হাই কোর্টে রিপোর্ট পেশ
এর আগে বিহারের জাল শংসাপত্র ব্যবহার করে এ রাজ্যে রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার অভিযোগে পাঁচজন চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছিল পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল। সেই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই চিকিৎসকদের নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে অন্য রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে এসে যাঁরা এ রাজ্যে চিকিৎসা করছেন, তাঁদের নথি পুনর্যাচাইয়ের দাবি জোরালো হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই নির্দেশিকা কার্যকর করে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ‘কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট’ (Compliance Report) জমা দিতে বলা হয়েছে। যা পরবর্তীতে হাইকোর্টে পেশ করা হবে। স্বাস্থ্য দপ্তরের এই নির্দেশিকাকে চিকিৎসকমহলে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।