১৭,৫০০ কোটির মেগা ফান্ড সংগ্রহের মাস্টারপ্ল্যান! বাজাজ ফাইন্যান্সের এই পদক্ষেপে কি বদলে যাবে শেয়ারের ভাগ্য?

শেয়ার বাজারে লাগাতার চাপের মুখে পড়ার মাঝেই এবার এক সুদূরপ্রসারী ও বিরাট পদক্ষেপ নিতে চলেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজাজ ফাইন্যান্স (Bajaj Finance)। বাজারের বর্তমান অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে কোম্পানিটি এককালীন বিপুল পরিমাণ মূলধন সংগ্রহের জোরালো প্রস্তুতি শুরু করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে কিউআইপি (QIP) বা যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মাধ্যমে মোট ১১,৭০০ কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি কোম্পানির প্রধান প্রোমোটার সংস্থা বাজাজ ফিনসার্ভকে (Bajaj FinServ) আরও ৫,৮০০ কোটি টাকার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হবে। সব মিলিয়ে এই দুই প্রক্রিয়া মিলে মোট ১৭,৫০০ কোটি টাকার বিশাল তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কোম্পানিটি। গত ১ অক্টোবর উভয় কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে এই মেগা প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই স্পেশাল ইজিএম (EGM)-এর মাধ্যমে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের চূড়ান্ত অনুমোদন চাওয়া হবে।
যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের জন্য কিউআইপি অফার
বাজাজ ফাইন্যান্সের বোর্ড ১ টাকা অভিহিত মূল্যের ইক্যুইটি শেয়ারের একটি কিউআইপি (QIP) অফার আনার অনুমোদন দিয়েছে। এই বিশেষ শেয়ারগুলি সরাসরি যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা বা কিউআইবি (QIBs)-দের কাছে ইস্যু করা হবে। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানিটির মূলধন ভিত্তি বা ক্যাপিটাল বেসকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার বাজারে পতন দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে এই বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাজাজ ম্যানেজমেন্ট।
মূল কোম্পানির জোরালো বাজি ও ফিনসার্ভের ভূমিকা
কিউআইপি ছাড়াও এই মেগা পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ৫,৮০০ কোটি টাকার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ওয়ারেন্টগুলি বাজারের কোনো বহিরাগত বা সাধারণ বিনিয়োগকারীকে দেওয়া হচ্ছে না, বরং এটি দেওয়া হচ্ছে মূল প্রোমোটার কোম্পানি বাজাজ ফিনসার্ভকে। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, বাজাজ ফিনসার্ভ ইতিমধ্যেই বাজাজ ফাইন্যান্সের ৫১.৩০ শতাংশ শেয়ারের নিরঙ্কুশ মালিকানা ধরে রেখেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ওয়ারেন্ট বরাদ্দের ঠিক সময়ই কোম্পানিটিকে মোট মূল্যের ২৫ শতাংশ অর্থ ক্যাশ বা পরিশোধ করতে হবে। বাকি ৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করতে হবে তখনই, যখন এই ওয়ারেন্টগুলি পরবর্তীতে ইক্যুইটি শেয়ারে রূপান্তরিত করা হবে। এই ওয়ারেন্টগুলিকে পুরোপুরি শেয়ারে রূপান্তর করার জন্য বাজাজ ফিনসার্ভ সময় পাবে মোট ১৮ মাস। যদি নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে কোম্পানি তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের প্রাথমিক পরিশোধিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে। আশা করা হচ্ছে, শেয়ারহোল্ডারদের সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই এই ওয়ারেন্ট বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে।
বিনিয়োগকারীদের শেয়ারহোল্ডিং ও ইক্যুইটি ডাইল্যুশনের প্রভাব
যেকোনো কোম্পানি যখন কিউআইপি বা অন্য কোনো উপায়ে নতুন শেয়ার বাজারে ছাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাজারে উপলব্ধ মোট শেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিদ্যমান বা পুরোনো বিনিয়োগকারীরা সরাসরি প্রভাবিত হন, কারণ তাঁদের হাতে থাকা অংশীদারিত্বের শতাংশ কিছুটা কমে যায়। অর্থনীতি ও শেয়ার বাজারের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইক্যুইটি ডাইল্যুশন’ (Equity Dilution)।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অংশীদারিত্বের শতাংশ কমে যাওয়ার মানেই কিন্তু এই নয় যে বিনিয়োগকারীদের বড় লোকসান হবে। যদি কোম্পানি এই নতুন সংগৃহীত তহবিলটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের ব্যবসা প্রসারে এবং মুনাফা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করতে পারে, তবে এই ডাইল্যুশনের নেতিবাচক প্রভাব সহজেই পুষিয়ে নেওয়া যায়। তবে যদি এই বিপুল তহবিল থেকে আশানুরূপ রিটার্ন না আসে, তবে শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস (EPS)-এর ওপর সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বাজারে শেয়ারের বর্তমান অবস্থান ও ব্যবসার গ্রাফ
গত ১ অক্টোবর, অর্থাৎ গান্ধী জয়ন্তীর আগের ট্রেডিং সেশনে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (BSE) বাজাজ ফাইন্যান্সের শেয়ার ১.২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৪৯.৩৫ টাকায় বন্ধ হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসের ব্যবধানে এই স্টকটির দর প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। অবশ্য গত বছরের অগাস্ট মাসে এই স্টকটি ১,১৭৭.৬০ টাকায় তার ৫২-সপ্তাহের সর্বকালীন সর্বোচ্চ মূল্যে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, বাজাজ ফিনসার্ভের শেয়ারও বিগত সেশনে সামান্য কমে ১,৭২৯.৯০ টাকায় বন্ধ হয়েছে এবং গত এক মাসে এর দামও প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তবে শেয়ারের স্বল্পমেয়াদি এই ওঠানামার বাইরেও কোম্পানির মূল ব্যবসায়িক বৃদ্ধি অত্যন্ত শক্তপোক্ত জায়গায় রয়েছে। আর্থিক লেনদেন বা টার্নওভারের দিক বিচার করলে দেখা যায়, ২০২৬ অর্থবর্ষে বাজাজ ফাইন্যান্সের মোট টার্নওভার একলাফে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৯,৮৫০.৭৯ কোটি টাকায়, যা এর আগের অর্থাৎ ২০২৫ অর্থবর্ষে ছিল ৫৯,৩৭৯.৭৪ কোটি টাকা। ফলে কোম্পানির এই নতুন মূলধন সংগ্রহ অভিযান ভবিষ্যতে তাদের ব্যবসার গ্রাফকে আরও কতদূর উঁচুতে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।