১.১৫ কোটি টাকার বিমা পেতে স্ত্রীকে খুন! ৩ সুপারি কিলার লাগিয়ে যে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে স্বামী, জানলে শিউরে উঠবেন

মধ্যপ্রদেশের জবলপুর জেলার পাটন থানা এলাকার একটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সামনে এসেছে, যা আদতে কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং ছিল এক ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত খুন। মোটা অঙ্কের টাকার বিমা দাবি হাতানোর লোভে নিজের তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ট্রাকচাপা দিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে খোদ স্বামীর বিরুদ্ধে। পুরো ঘটনাটিকে সাধারণ একটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, পুলিশের সাইবার সেল ও প্রযুক্তিগত তদন্তের কল্যাণে ফাঁস হয়ে গেছে এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের সমস্ত রহস্য।

যেভাবে সামনে এল চাঞ্চল্যকর সত্য
গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে পাটন থানার ‘ডায়াল ১১২’-এ একটি জরুরি ফোন আসে। জানানো হয় যে নুনসার এলাকার হাটপুর রানিটাল রোডের পাশে এক অজ্ঞাতপরিচয় মহিলার রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। প্রথম দেখায় পুলিশের কাছেও ঘটনাটি একটি দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় ঘটা পথ দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। এরপর পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসতেই চক্ষু চড়কগাছ হয় তদন্তকারীদের। রিপোর্টে প্রকাশ পায় যে মৃত কবিতা চৌধুরী নামের ওই তরুণী তিন মাসের গর্ভবতী ছিলেন। অর্থাৎ, এই বর্বরোচিত হামলায় শুধু এক নিরপরাধ নারীই নন, বরং তাঁর গর্ভের অনাগত সন্তানটিও নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে।

প্রযুক্তিগত তদন্ত ও তিন শুটার গ্রেপ্তার
ঘটনার আকস্মিকতা ও কিছু অসঙ্গতি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। এরপর অপরাধ দমন ও কারিগরি দল ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। আশেপাশের এলাকার মোবাইল টাওয়ারের ডাম্প ডেটা এবং আধুনিক নজরদারির মাধ্যমে বেশ কিছু সন্দেহজনক নম্বর চিহ্নিত করে পুলিশ। এর ভিত্তিতে পাটন এলাকা থেকে তিন যুবককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা মাত্রই বেরিয়ে আসে আসল সত্য।

গ্রেপ্তারকৃত তিন সুপারি কিলার হলো বিক্রম আহিরওয়ার (৩১), ধনরাম ওরফে কারিয়া (২২) এবং রামজি চৌধুরী (২১)। তিনজনই পাটনের চৌধুরী মহল্লার বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই খুনটি করার জন্য অভিযুক্তদের ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার সুপারি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অগ্রিম হিসেবে ১৫,০০০ ও ২২,০০০ টাকার দুটি কিস্তি এবং পরবর্তীতে ৫,০০০ টাকার কয়েকটি ছোট কিস্তিতে টাকা মেটানো হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিকআপ গাড়িটিও বাজোপ্ত করেছে পুলিশ।

প্রেমের বিয়ে ও ১.১৫ কোটি টাকার বিমা পলিসি
তদন্তে নেমে পুলিশ দম্পতির ব্যক্তিগত জীবন ও আর্থিক পটভূমির চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে। জানা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রয়াস পান্ডে ও কবিতা চৌধুরীর পরিচয় হয়েছিল। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্পর্কের পর তাঁরা আদালতে গিয়ে বিয়ে করেন এবং ভেড়াঘাটের আমা হিনোটা এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস শুরু করতেন। প্রয়াস পেশায় একজন নোটারি এবং আইন বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা থাকায় তিনি আইনি মারপ্যাঁচ সম্পর্কে ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁদের আন্তঃবর্ণ বিবাহের কারণে উভয় পরিবারই তাঁদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল।

প্রাথমিক তদন্ত বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ ছিল বিপুল পরিমাণ বিমার টাকা। মৃত কবিতার ‘টাটা এআইএ’ বিমায় প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার ঋণ ছিল। পাশাপাশি, তাঁর নামে এলআইসি (LIC)-র প্রায় ৯০ লক্ষ টাকার একটি বিশাল পলিসিও ছিল। এছাড়াও বেশ কিছু স্বাস্থ্য বিমা এবং অন্যান্য পলিসির হদিশ মিলেছে। এই পলিসিগুলির নমিনেটর কে ছিলেন এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে মোট কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে বিমা সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছে পুলিশ।

মূল অভিযুক্ত স্বামী পলাতক
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, মূল অভিযুক্ত তথা নিহতের স্বামী প্রয়াস পান্ডে (যিনি পাটানে নোটারি হিসেবে কাজ করেন) এই পুরো হত্যাকাণ্ডের মূল ছক কষেছিলেন। তিনি তাঁর দোকানের সহকর্মী মনসিংহ লোধিকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার এক মাস আগেই বিক্রম আহিরওয়ারের নামে একটি পিকআপ ভাড়ায় নেওয়া হয় যাতে পুলিশের মনে কোনো সন্দেহ না জাগে। ৩ সেপ্টেম্বর তিন শুটারকে ডেকে লাল স্কুটারের ছবি ও নম্বর দেখিয়ে স্ত্রীকে চিনিয়ে দেওয়া হয়। ৪ সেপ্টেম্বর রাতে কাজের অজুহাতে কবিতাকে একা রাস্তায় পাঠানো হলে, ওঁত পেতে থাকা শুটাররা তাঁর স্কুটারে সজোরে ধাক্কা মেরে মাথার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনায় তিন ভাড়াটে খুনি ধরা পড়লেও, মূল অভিযুক্ত স্বামী প্রয়াস পান্ডে ও তাঁর সহযোগী মনসিংহ লোধি ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য পাটন ও নুনসার থানার দুটি বিশেষ দল বিভিন্ন জায়গায় লাগাতার অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের দাবি, মূল অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে এই জঘন্য অপরাধের পেছনের সমস্ত জট আরও পরিষ্কার হবে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *