তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ এখন বিজেপির ভক্ত! কবীর সুমনের মুখে পাপিয়া অধিকারীর প্রশংসা শুনতেই রাজ্য রাজনীতিতে ঝড়

রাজনীতির ময়দানে কবীর সুমনের অবস্থান বরাবরই এক আলাদা ও স্বতন্ত্র জায়গাসমেত আলোচিত। গান, সাহিত্য ও নানা সাংস্কৃতিক পরিসরের পাশাপাশি একটা সময় তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতেও দেখা গিয়েছিল। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে পরবর্তী সময়ে দলের সঙ্গে তাঁর একাধিক মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে। ২০১০ সালে দল ও সাংসদ পদ ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এরপর ২০১৩ সালে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি আর প্রার্থী হবেন না।

সেই কবীর সুমনেরই সম্প্রতি একটি ভিডিও বার্তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে ফের তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। টালিগঞ্জের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী তাঁর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে কবীর সুমনের সেই বক্তব্যের ভিডিওটি শেয়ার করেছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে পাপিয়া লিখেছেন, “এই জন্যই পাল্টেছে, BJP এসেছে। আমরা আপনার পাশে। আমরা আপনাদের সেবায়। আপনাদের সাথেই।”

ঠিক কী বলেছেন কবীর সুমন?
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে নিজের পরিচয় দিয়ে কবীর সুমন জানান, তিনি ১৯ নম্বরের যে বাড়িতে বসবাস করেন, তা ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। তাঁর বাড়ির পাশেই একটি বিশাল ও লম্বা গাছ ছিল। সময়মতো সেই গাছটি ছাঁটাই না করলে আসন্ন ঝড়-বৃষ্টিতে সেটি নুয়ে পড়ে পাশের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎবাহী তারের ওপর আছড়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি যে যে কোনো মুহূর্তে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

সুমনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর এলাকার তৎকালীন কাউন্সিলরের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেননি। এমনকি নতুন সরকারের কাউকেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। শেষ পর্যন্ত এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমেই তিনি টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর জোগাড় করেন। এর আগে পাপিয়া অধিকারীর সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল না।

বিজেপি বিধায়কের তৎপরতায় মুগ্ধ শিল্পী
এরপর নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে পাপিয়াকে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান সুমন। কবির সুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিন্দুমাত্র দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেন বিধায়ক। পুরসভার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করে গাছ কাটার জন্য একটি উঁচু গাড়ির ব্যবস্থা করা হয় এবং বিপজ্জনক অংশটুকু কেটে ছেঁটে ফেলা হয়। শুধু গাছ ছাঁটাই করাই নয়, কাটা ডালপালা ও সমস্ত আবর্জনাও সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তার আলো আচমকা নিভে যায়। ঠিক কী কারণে আলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তা তাঁর অজানা ছিল। তবে তাঁর দাবি, বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে নজর আসে পাপিয়া অধিকারীর। এই প্রসঙ্গে তিনি সায়ন্তন সান্যাল নামের এক ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেন। নাম উচ্চারণে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে সুমন জানান, তাঁর যতটুকু ধারণা, সায়ন্তকও বিজেপির সঙ্গে যুক্ত এবং পাপিয়ার অন্যতম সহযোগী। সায়ন্তন নিজে লোক নিয়ে এসে তাঁর বাড়িতে হাজির হন এবং মাত্র এক দিনের মধ্যেই রাস্তার লাইট ঠিক করার ব্যবস্থা করেন।

রাজনৈতিক মহলে শোরগোল
নিজের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এলাকার সামগ্রিক পরিকাঠামো নিয়ে কথা বলেন কবীর সুমন। তিনি বলেন, নতুন সরকার আসার পর থেকে যে স্থানীয় স্তরে নিয়মিত কাজ হচ্ছে, তা তিনি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। পাড়ার দিকে এখন যথেষ্ট নজর দেওয়া হচ্ছে, রাস্তায় যত্রতত্র আবর্জনা জমে থাকছে না, নিরবচ্ছিন্ন জল সরবরাহ মিলছে, বিদ্যুৎ পরিষেবা সচল রয়েছে এবং নিয়মমাফিক ময়লাও পরিষ্কার করা হচ্ছে।

ভিডিওর শেষাংশে নিজের বয়সের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সুমন বলেন, এই বয়সে তাঁর নিজস্ব চাহিদা অত্যন্ত সীমিত; এলাকার এই দৈনন্দিন পরিষেবাটুকুই তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, তাঁর সহনাগরিকরাও হয়তো একই ধরনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারবেন। সবশেষে টালিগঞ্জের বিধায়কের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল— তাঁর নিজের জন্য নয়, বরং গোটা পাড়া ও এলাকার জন্য যে কাজগুলি করা হয়েছে, তা তাঁর চিরকাল মনে থাকবে। সকলের মঙ্গল কামনা ও নমস্কার জানিয়ে তিনি ভিডিওটি শেষ করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে টালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে লড়ে ৮৮,৪০৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন পাপিয়া অধিকারী। নির্বাচন কমিশনের ফলাফল অনুযায়ী, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী অরূপ বিশ্বাস পেয়েছিলেন ৮২,৩৯৪ ভোট। ফলে এককালের তৃণমূল সাংসদ কবীর সুমনের মুখে বর্তমান বিজেপি বিধায়ক ও দলের কাজের এমন ভূয়সী প্রশংসা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে ভিডিওটি ইতিমধ্যেই নেটদুনিয়ায় চর্চার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *