প্রিভিউ পাস দুর্নীতি কাণ্ডে সরাসরি মমতার নাম! ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থা থেকে ৩০ লক্ষ টাকা স্থানান্তরের চাঞ্চল্যকর দাবি ইডির

দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ পাস’ ঘিরে আর্থিক অনিয়মের মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই একে একে চাঞ্চল্যকর আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে আনছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। আর এই তদন্তের সূত্র ধরেই এবার সরাসরি উঠে এল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নাম। প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিশিষ্ট গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইডি। যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, ইন্দ্রনীলের সংস্থা ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল।

ইডির বিস্ফোরক দাবি ও জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব
মূলত দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং UNESCO-র নাম ব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে ইডির এই মেগা তদন্ত শুরু হয়। এই মামলার তদন্তে নেমে গত মঙ্গলবার তাঁর বাড়ি সহ একাধিক ঠিকানায় একযোগে তল্লাশি চালান গোয়েন্দারা। এরপর বুধবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দপ্তরে হাজিরা দেন প্রাক্তন মন্ত্রী। একটানা প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে তাঁকে ম্যারাথন জেরা করা হয়। জেরা পর্ব শেষের পরই তদন্তের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য জনসমক্ষে আনে কেন্দ্রীয় সংস্থাটি।

ইডির প্রকাশিত বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর মালিকানাধীন ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন নগদ ৩.৮ কোটিরও বেশি টাকা জমা পড়ার প্রমাণ মিলেছে। আর সেই একই সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে ইডি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী, জেরা চলাকালীন ইন্দ্রনীল সেন নাকি জানিয়েছেন যে ওই নির্দিষ্ট অর্থটি ‘রয়্যালটি’ বাবদ প্রদান করা হয়েছিল।

অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
তবে ঠিক কোন নির্দিষ্ট কাজ, গান বা সৃষ্টির জন্য ওই রয়্যালটি দেওয়া হয়েছিল, ইডির বিবৃতিতে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলস্বরূপ, ৩০ লক্ষ টাকার এই আর্থিক লেনদেন ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে জোর জল্পনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইডির ওই বিবৃতিতে এই নির্দিষ্ট লেনদেনটিকে সরাসরি কোনো অপরাধমূলক কাজ বা দুর্নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি; বরং চলমান তদন্তের একটি অংশ হিসেবেই এই তথ্য সামনে আনা হয়েছে।

এর পাশাপাশি, ইন্দ্রনীল সেনের মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন ও সংস্কৃতি দপ্তরের ৮৫ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের একাধিক টেন্ডার তাঁরই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ধ্রুবজ্যোতি বোস ও দীপেশ রায়ের সংস্থাগুলি কীভাবে পেল, তাও খতিয়ে দেখছে ইডি। তদন্তে উঠে এসেছে যে, পরবর্তীকালে ওই সংস্থাগুলি থেকে ইন্দ্রনীলের বিভিন্ন আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাতেও বড় অংকের টাকা ঘুরেছিল। এছাড়াও, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে UNESCO-র সঙ্গে সরকারি বা অনুমোদিত সম্পর্কের মিথ্যে দাবি করে ‘মাসআর্ট’-এর মাধ্যমে এক লক্ষেরও বেশি প্রিভিউ শোর টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল, যার আর্থিক গতিপথও এখন গোয়েন্দাদের স্ক্যানারে রয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। গণতান্ত্রিক তৃণমূলের নেতা মদন মিত্র মন্তব্য করেছেন, “মমতা ইন্দ্রনীল সেনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, এটা ভাবতে আমার অসুবিধা হচ্ছে।” অন্যদিকে, এই লেনদেনের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা চেয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তাঁর দাবি, “এটাকে রয়্যালটি না বলে কাটমানি বলাই ভালো। এই ঘটনার নেপথ্যে যে মমতার হাত ও মাথা রয়েছে, তা আমি আগেই বলেছিলাম।” সবমিলিয়ে, প্রিভিউ পাসের টাকা কোথায় গেল এবং এই গোটা চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা নিয়ে ইডির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন সকলের নজর রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *