রান্নাঘরে কি বিষ খাচ্ছেন? প্লাস্টিকের চাল আর নকল ডিমের আসল সত্যিটা জানেন কি?

ফেসবুক কিংবা ইউটিউব খুললেই আজকাল প্লাস্টিকের চাল আর নকল ডিম নিয়ে নানা ধরনের ভিউজসর্বস্ব ভিডিয়ো চোখে পড়ে। সেই সব কাণ্ডকারখানা দেখে অনেকেই চমকে ওঠেন। মনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নিজের চোখে যা দেখলাম, তা কি মিথ্যে হতে পারে? কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে এবং বিজ্ঞানের সাহায্য নিলে বোঝা যায়, এই সমস্ত প্রচারের বেশিরভাগটাই স্রেফ গুজব ছাড়া আর কিছু নয়।
নকল ডিম কি আদৌ তৈরি সম্ভব?
সোশাল মিডিয়ায় ছড়ানো বিভিন্ন ভিডিয়োতে দেখা যায়, মোম, প্যারাফিন, জিপসাম গুঁড়ো এবং নানা রাসায়নিক মিশিয়ে ধাপে ধাপে নকল ডিম তৈরি করা হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, উৎসবের সময় প্রদর্শনী বা সাজানোর জন্য এমন কৃত্রিম ডিম বানানো হয়। এমনকি ক্যালসিয়াম অ্যালজিনেট দিয়ে ডিমের সাদা অংশও তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই ডিম কি আমরা বাজারে কিনে খাচ্ছি?
অঙ্কের হিসাব বলছে, এর উত্তর একেবারে না। আসল ডিমের দামের তুলনায় এই কৃত্রিম ডিম বানানোর খরচ অনেক বেশি। চিন বা অন্য কোথাও থেকে অত খরচ করে রাসায়নিকের ডিম এনে দেশের বাজারে আট থেকে দশ টাকায় বিক্রি করলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা গুটিকরে পথে বসতে হবে। তাহলে অনেক সময় ডিমের খোসার নিচে কাগজের মতো ওটা কী দেখা যায়? আসলে ডিমের খোসার ঠিক নিচেই একটি পাতলা পর্দা থাকে। তীব্র গরমে বা কড়া রোদে অনেক দিন রাখা হলে সেই পর্দা শুকিয়ে কাগজের মতো হয়ে যায়। সাধারণ এই জৈবিক পরিবর্তনকে প্লাস্টিক ভেবে ভুল করাটা পুরোপুরি বোকামি।
ভাতের বল লাফায় কেন?
নকল চাল নিয়েও কম রটনা নেই। অনেকে ভাত রান্না করে সেটাকে হাতের তালুতে বলের মতো পাকিয়ে মেঝেতে ফেললে তা রাবারের বলের মতো বাউন্স করে। তখনই ভিডিয়ো বানিয়ে দাবি করা হয় যে এটি প্লাস্টিকের চাল। অথচ বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম বলে, ভাত মূলত কার্বোহাইড্রেট। আর কার্বোহাইড্রেটের স্থিতিস্থাপকতা অনেক সময় রবারের মতো হতে পারে। তাই রান্না করা ভাত একটু শক্ত হলে তা লাফাতেই পারে। এর জন্য চালের প্লাস্টিক হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া চাল অনেক দিন পুরনো হয়ে নষ্ট হয়ে গেলে তার মাড় শুকিয়েও শক্ত রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথাটি হলো বিজ্ঞানের নিয়মে জলের স্ফুটনাঙ্ক একশো ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ যেকোনো ধরনের প্লাস্টিক গলাতে হলে কমপক্ষে একশো ষাট থেকে দুশো দশ ডিগ্রি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। তাই ফুটন্ত জলে দিলে প্লাস্টিক গলে কখনোই স্বাভাবিক ভাতের মতো সেদ্ধ হতে পারে না।
গবেষণা ও অর্থনীতির হিসাব কী বলছে?
কয়েক বছর আগে বাজারে প্লাস্টিক চাল পাওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসন ও খাদ্য দফতর সেই চাল বাজেয়াপ্ত করেছিল। এরপর দেশের সরকারি গবেষক ও বিজ্ঞানীরা ল্যাবে সেই চাল পরীক্ষা করে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, নমুনায় প্লাস্টিক জাতীয় কোনো উপাদানের অস্তিত্বই ছিল না।
অর্থনীতির দিক থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার। বাজারে সাধারণ চালের যে দাম, তার চেয়ে অনেক বেশি দাম নিম্নমানের প্লাস্টিকের। ফলে লাভ তো দূরের কথা, প্লাস্টিকের সঙ্গে চাল মিশিয়ে বিক্রি করলে ব্যবসায়ীদের চরম আর্থিক লোকসান হবে।
সোশাল মিডিয়ার দুনিয়ায় নানা চমকপ্রদ ভিডিয়ো সহজেই মানুষের নজর কাড়ে। কিন্তু যেকোনো আজব দাবি বিশ্বাস করার আগে একটু বিজ্ঞান আর সাধারণ বুদ্ধির হিসাব মিলিয়ে নেওয়া দরকার। গুজবে কান না দিয়ে এবার থেকে পুরোপুরি নিশ্চিন্তে আপনার খাবার খান।