অধ্যাপকদের বদলি বিল নিয়ে রাজ্যপালের দরবারে যাদবপুর! ৪০১ জনের সই করা চিঠিতে কিসের এত আতঙ্ক?

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত নতুন আইন এবং অধ্যাপকদের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলির বিধান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠন (JUTA)। সম্প্রতি বিধানসভায় পাশ হওয়া ‘West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Amendment Bill, 2026’-এর নির্দিষ্ট কিছু বিতর্কিত বিধান অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা। এই মর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০১ জন অধ্যাপক সই করে রাজ্যপাল তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন এবং ওই বিলে অনুমোদন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

জুটার আপত্তির মূল কারণ ও আইনি জটিলতা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠনের বক্তব্য, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন, বিধি এবং স্বতন্ত্র নিয়োগ কাঠামো রয়েছে। সেই স্বায়ত্তশাসনকে উপেক্ষা করে অধ্যাপকদের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নিয়োগের সময় নির্ধারিত কর্মশর্ত ও কর্মস্থলের নিশ্চয়তা সম্পূর্ণ প্রশ্নের মুখে পড়বে। সাধারণত শিক্ষকদের নিয়োগপত্রে এমন কোনো আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলির শর্ত থাকে না।

এ বিষয়ে জুটার সম্পাদক রাজেশ্বর সিনহা জানান, “ইতিমধ্যে দুই-তিন দফায় আচার্যের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কলকাতা, প্রেসিডেন্সি, রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুরসহ রাজ্যের ১৬টি ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধিদের তরফে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। আইনি জটিলতা ও গবেষণা সংক্রান্ত সমস্যার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছি আমরা। রাজ্যপাল একজন বিচক্ষণ মানুষ, তিনি সবদিক বিবেচনা করে দেখবেন বলেই আমরা আশাবাদী।” তবে একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ের পথ খোলা রাখা হবে বলেও সাফ জানিয়েছেন তিনি।

গবেষণায় মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
অধ্যাপকদের আশঙ্কা, এই বদলি নীতির ফলে কেবল কর্মস্থলের অনিশ্চয়তাই তৈরি হবে না, বরং সরাসরি ধাক্কা খাবে উচ্চশিক্ষার গবেষণা ক্ষেত্র। কারণ, প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট গবেষণাগার, মহার্ঘ যন্ত্রপাতি, গ্রন্থাগার এবং গবেষক দলের গভীর সমন্বয় থাকে। প্রধান গবেষককে মাঝপথে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে দিলে চলমান প্রকল্পগুলির ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ নষ্ট হতে পারে।

পাশাপাশি পিএইচডি (Ph.D.) গবেষণার ক্ষেত্রেও বড়সড় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মত তাঁদের। গবেষক ও তত্ত্বাবধায়কের নিয়মিত যোগাযোগ, নথিপত্রে স্বাক্ষর এবং একই গবেষণা পরিবেশে কাজ করার জন্য কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত জরুরি। দূরবর্তী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হলে সেই প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠবে। এছাড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষাক্রম ও পাঠদান পদ্ধতি থাকায় বদলির জেরে ছাত্রছাত্রী এবং দুই প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পঠনপাঠনও ব্যাহত হবে।

বিকল্প প্রস্তাব ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের আশঙ্কা
তবে রাজ্যের অনগ্রসর বা পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছেন না অধ্যাপকরা। জুটার তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, স্থায়ী বদলির পরিবর্তে প্রয়োজনে কয়েক সপ্তাহ বা এক মাসের স্বল্পমেয়াদি দায়িত্ব দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও পর্যাপ্ত অর্থ ও মানবসম্পদ দিয়ে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করার পক্ষে সওয়াল করেছেন তাঁরা।

চিঠির সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই বদলির বিধানটিকে ভবিষ্যতে সরকার-বিরোধী মত প্রকাশকারী বা ভিন্নমতের অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে ‘শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এমনকি উচ্চপদস্থ মহলের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই ‘বদলির মাধ্যমে শাস্তি’-র পরোক্ষ হুমকির কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, উচ্চশিক্ষার মান ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবিলম্বে এই বিতর্কিত বদলি নীতি প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানিয়েছেন যাদবপুরের শিক্ষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *