আইপিও প্রাইসেরও নিচে নেমে গেল পলিসিবাজারের শেয়ার! মাত্র ৬ দিনের ধস দেখে মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের

শেয়ার বাজারের নিয়মকানুনের আকস্মিক পরিবর্তন কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির আস্ত ব্যবসায়িক মডেলকে এক নিমেষে তছনছ করে দিতে পারে, তার সাম্প্রতিকতম ও জলজ্যান্ত উদাহরণ হলো পিবি ফিনটেক (PB Fintech)। জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পলিসিবাজার (Policybazaar) নামে সুপরিচিত এই কোম্পানির শেয়ার বর্তমানে শেয়ার বাজারে তীব্র পতনের মুখে পড়েছে। মাত্র ছ’টি মাত্র ট্রেডিং সেশনের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এমন এক রেকর্ড গতিতে নিচে নেমেছে যে, দীর্ঘ পাঁচ বছরের সমস্ত লভ্যাংশ নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। গত ১ অক্টোবর ট্রেডিং সেশনের শেষের দিকে শেয়ারটির দরপতন এমন জায়গায় পৌঁছায় যে তা একেবারে কোম্পানির আইপিও-র (IPO) ইস্যু মূল্যেরও নিচে নেমে যায়। বাজারের পলিসি বা নিয়মের সামান্য পরিবর্তন কীভাবে পুরো বাজারের গতিপথ আমূল বদলে দিতে পারে, শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিস্থিতি এক কঠিন শিক্ষা হয়ে উঠেছে।
মাত্র এক সপ্তাহে ১৭ শতাংশ পতন ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি
ক্রমাগত শেয়ার বিক্রির হিড়িকে বিনিয়োগকারীরা এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার জোগাড় হয়েছেন। গত ১ অক্টোবর পিবি ফিনটেকের শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৮ শতাংশ কমে ৯৮৪ টাকায় বন্ধ হয়। এমনকি লেনদেন চলাকালীন এর দাম ৯৮০ টাকার মনস্তাত্ত্বিক সীমারও নিচে নেমে গিয়েছিল। মাত্র এক সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে এই শেয়ারটির দাম ১৭ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। কোম্পানিটির স্টক মার্কেট রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ই জানুয়ারি এই শেয়ারটি তার সর্বকালীন সর্বোচ্চ স্তর ২,২৫৪ টাকায় পৌঁছেছিল। তারপর থেকেই বাজারে শেয়ারটিতে লাগাতার ওঠানামা লেগেই ছিল। কিছু সময় ধরে এর দাম ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকার ঘরে ঘোরাফেরা করলেও সাম্প্রতিক এই ধস এটিকে বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও লোকসানজনক স্টকে পরিণত করেছে।
হঠাৎ এই মহাধসের নেপথ্যের আসল কারণ কী?
শেয়ার বাজারে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই স্টকটির এমন আকস্মিক ও বড় পতনের মূল কারণ হলো দেশের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI)-এর একটি নতুন প্রস্তাব। সম্প্রতি বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একটি পরামর্শপত্র (Consultation Paper) পেশ করেছে, যেখানে মূলত বীমা পলিসি বিক্রির কমিশন সংক্রান্ত নিয়মনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বীমা কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর এবং এজেন্টদের আয়ের ওপর।
এদিকে, পিবি ফিনটেকের ব্যবসার মূল আয়ের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অংশ আসে বিভিন্ন ধরনের বীমা পণ্য বিক্রি করার সুবাদেই। সুতরাং, নতুন এই নিয়মকানুন কার্যকর হলে কোম্পানির সামগ্রিক আয়ে এক বিশাল ধস নামতে পারে—এই আশঙ্কা করেই বড় বড় বিনিয়োগকারীরা স্টক বিক্রি করে সরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন।
ব্রোকারেজ ফার্মগুলোর রেটিং অবনমন ও টার্গেট প্রাইস কাটছাঁট
বাজারে শেয়ার বিক্রির লাগাতার এই চাপের জেরে নামী বাজার বিশেষজ্ঞরা স্টকটির বিষয়ে তাঁদের পূর্ববর্তী অবস্থান সম্পূর্ণরূপে বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ ফার্ম পিবি ফিনটেকের লক্ষ্যমাত্রা মূল্য (Target Price) এক ঝটকায় অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি (HSBC) এই স্টকটির রেটিং ‘বাই’ (Buy) থেকে কমিয়ে সরাসরি ‘হোল্ড’ (Hold)-এ নামিয়ে এনেছে।
দোলাত ক্যাপিটাল আরও এক ধাপ এগিয়ে এর রেটিং কমিয়ে সরাসরি ‘সেল’ বা বিক্রির পর্যায়ে নামিয়েছে।
এছাড়া ম্যাকোয়ারিও এর রেটিং নামিয়ে ‘নিউট্রাল’ বা নিরপেক্ষ ঘোষণা করেছে।
এই তিনটি প্রধান ব্রোকারেজ ফার্ম বর্তমানে পিবি ফিনটেকের জন্য মাত্র ১,১৫০ টাকার একটি নতুন লক্ষ্যমাত্রা মূল্য নির্ধারণ করেছে। এই রেটিংগুলি পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে কোম্পানির পক্ষে শেয়ার বাজারে আগের জায়গায় ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন লড়াই হতে চলেছে।
আইপিও বিনিয়োগকারীদের সমস্ত আশা ধূলিসাৎ
আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালে পিবি ফিনটেক তাদের বহুল চর্চিত আইপিও বাজারে নিয়ে এসেছিল। সেই সময় কোম্পানিটি ২ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ৯৮০ টাকা মূল্যে ইস্যু করেছিল। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সময় এটি দুর্দান্ত একটি প্রিমিয়াম পেয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই স্টকটির উল্কাসম উত্থান প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেই দুর্দান্ত ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ আইপিও-র সুবাদে যাদের পোর্টফোলিওতে শেয়ার এনে দিয়েছিল, তাঁদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। কিন্তু নিয়মের মারপ্যাচে বাজারের এই ছোট্ট একটা ধাক্কা সেই সমস্ত সোনালী স্বপ্ন এক লহমায় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। যারা দীর্ঘমেয়াদী লাভের আশায় বুক বেঁধে এত বছর ধরে বিনিয়োগ ধরে রেখেছিলেন, তাঁরা এখন বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।