‘চোখ বন্ধ থাকলেও জানতাম প্লেনে কী ঘটছে!’ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েও জীবন বাঁচালেন কোন ভারতীয় ক্যাপ্টেন?

ফ্লাইদুবাইয়ের (Flydubai) পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচারের অবিশ্বাস্য সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধি এখন বিশ্বজুড়ে এক অন্যতম আলোচনার বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু—প্রত্যেকেই তাঁর বীরত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই বীর পাইলট। তাঁর দ্রুত আরোগ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে ভারতজুড়ে এখন শুভকামনা ও প্রার্থনার ঢল নেমেছে। এরই মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং ভিডিও কলের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন স্মিতের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি সেই চরম বিপদের মুহূর্তের রোমহর্ষক বিবরণ শুনেছেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে আবেগঘন কথোপকথন
ভিডিও কলের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্যাপ্টেন স্মিতের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন এবং তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, ‘‘আপনার সাহস, ধৈর্য এবং সঠিক সময়ে নেওয়া প্রজ্ঞা এক নিমেষে বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। আজ সমগ্র দেশ বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে পারে যে, আমরা ভারতীয়েরা জীবন হরণকারী নই, বরং জীবন রক্ষাকারী।’’
প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘‘শরীরের এত বড় ক্ষত সহ্য করেও, জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পরেও আপনারা নিজেদের জীবনের কথা এক মুহূর্তের জন্য ভাবেননি। আপনারা প্রতিটি যাত্রীর জীবন সুরক্ষিত করেছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, ১৪০ কোটি দেশবাসীকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করেছেন। আর ঠিক এই কারণেই আমি আজ অন্তর থেকে গর্ববোধ করছি।’’
ককপিটের অন্দরের সেই ভয়ানক মুহূর্ত
প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন ক্যাপ্টেন স্মিতের কাছে জানতে চান যে, দুর্ঘটনার ঠিক সেই সময় ককপিটে আসলে কী ঘটেছিল, তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই পাইলট। ক্যাপ্টেন স্মিত জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ। তিনি বলেন, ‘‘স্যার, সেই মুহূর্তে আমি আমার নিজের জীবনের জন্য লড়াই করছিলাম। কিন্তু একটা মুহূর্ত এমন এসেছিল যখন আমি বুঝেছিলাম যে, যদি আমি নিজে কিছু না করি—যেহেতু আমি ছিটকে পড়ে গিয়েছিলাম—তাহলে আমি আর উঠতেই পারব না। ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিমান চালিয়েছি, গত ১১ বছর ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে আছি। আমি চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারি জাহাজে ঠিক কী ঘটছে!’’
স্মিত আরও জানান, নিচে পড়ার সময় তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে প্লেনটি হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সেটাই ছিল জীবনের শেষ ধাক্কা। সেই মুহূর্তে নিজেকে চাঙ্গা করে তিনি কোনওমতে দরজা পর্যন্ত পৌঁছান এবং বাকিদের সঙ্গে মিলে সকলের জীবন রক্ষা করেন।
কষ্টের সময়ে মনে পড়ে হনুমান চালিসা
কথা বলতে বলতেই একসময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ক্যাপ্টেন স্মিত। তিনি গদগদ কণ্ঠে বলেন, ‘‘যখনই আমি চরম কষ্টের মধ্যে থাকি, আমার শুধু হনুমান চালিসার কথাই মনে পড়ে। এমনকি ওই দুর্ঘটনার সময়েও আমি একটানা হনুমান চালিসা পাঠ করছিলাম এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ঈশ্বরই আমাকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়েছেন। আপনার ফোন পেয়ে আজ আমার বুক গর্বে ভরে গেছে। আমি দুঃখিত যে আপনার সামনেই কেঁদে ফেললাম, স্যার!’’
স্মিতের এই অকপট স্বীকারোক্তিতে আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর পরিবার ও মায়ের মূল্যবোধকে স্যালুট জানান। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে জানান যে, দেশজুড়ে সমস্ত মন্দির ও তীর্থস্থানে তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনা ও আরতি চলছে। গোটা দেশ আজ এই বীর সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় তাকিয়ে রয়েছে।