সাতশো কোটি লিটার ইথানল বিক্রি হচ্ছে না! ভারতের জ্বালানি বাজারে বিরাট ধস, মাথায় হাত উৎপাদকদের

অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে এবার এক অভূতপূর্ব অতিরিক্ত সরবরাহ বা ওভারসাপ্লাই সংকটের মুখে পড়েছে ভারতের ইথানল শিল্প। সরকারি উদ্যোগে জ্বালানি মিশ্রণের মাত্রা বাড়ানোর পর রাতারাতি উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়িয়ে ফেলেছিলেন উৎপাদকরা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, দেশজুড়ে প্রায় ৭০০ কোটি লিটার (৭ বিলিয়ন লিটার) অব্যবহৃত ইথানল পড়ে রয়েছে, যার জন্য কোনো স্পষ্ট বাজার বা ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলস্বরূপ, চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এখন নতুন ক্রেতা এবং বিকল্প বাজারের খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠেছেন শিল্পপতিরা।
কেন এই ভয়াবহ অতিরিক্ত সরবরাহ?
শিল্প বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট ইথানল উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ বিলিয়ন লিটারে গিয়ে ঠেকেছে এবং চলতি বছরে তা আরও চার বিলিয়ন লিটার বাড়তে চলেছে। অথচ সরকারের ‘ই২০’ (E20) জ্বালানি মিশ্রণ কর্মসূচির জন্য বছরে মাত্র ১১ বিলিয়ন লিটার ইথানল প্রয়োজন হয়। এর বাইরে অ্যালকোহল, ওষুধশিল্প এবং রাসায়নিকের মতো জ্বালানি-বহির্ভূত ক্ষেত্রগুলিতে মোটে ৩ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন লিটার ইথানল ব্যবহৃত হয়।
হিসাব বলছে, সব মিলিয়ে প্রায় ৭ বিলিয়ন লিটার ইথানলের কোনো সুনির্দিষ্ট ক্রেতা বা ব্যবহার নেই। বাধ্য হয়েই দেশের ডিস্টিলারিগুলি তাদের মোট ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। আগামী তিন বছর ধরে এই ক্ষমতা ব্যবহারের হার বড় জোর ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে একা মহারাষ্ট্রেই প্রায় ২.৭৭ বিলিয়ন লিটার অতিরিক্ত ইথানল মজুত থাকার অনুমান করা হচ্ছে।
সরকারের নীতি বদল ও গ্রাহকদের অসন্তুষ্টি:
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত আগস্ট পর্যন্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে ৮.৯৫ বিলিয়ন লিটার ইথানল সরবরাহ করেছেন উৎপাদকরা। ২০২৫-২৬ (নভেম্বর-অক্টোবর) অর্থবছরের জন্য ১০ বিলিয়ন লিটার সরবরাহের চুক্তিবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এই পরিমাণ নেহাত কম নয়। তবে সাধারণ গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে ই২০ জ্বালানি নিয়ে নানা অসন্তুষ্টি দানা বাঁধায় সরকার সাময়িকভাবে পিছু হটেছে। আপাতত ই২৫ বা ই৩০-এর মতো উচ্চতর ফ্লেক্সি-ফুয়েল মিশ্রণ বাধ্যতামূলক করার সমস্ত পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে। সরকারি রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে কেবল ই২০ চালুই রাখা হবে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্র জানিয়েছে যে এই কর্মসূচির প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ২০২৭ সালের আগে স্পষ্ট হওয়া সম্ভব নয়।
সমাধানের উপায় কী? বিকল্পের খোঁজ:
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা। উইলো ইন্ডিয়ার চিফ সেলস অফিসার রবীন্দ্র উৎগরিকরের মতে, সব গাড়ির জন্য একই মিশ্রণ বাধ্যতামূলক না করে আমেরিকা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলির কায়দায় E10, E20 এবং E85-এর মতো বিভিন্ন মিশ্রণের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। এতে গাড়িচালকরা নিজেদের গাড়ির বয়স ও প্রযুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন এবং ইথানলের ব্যবহারও সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। প্রথম প্রজন্মের ইথানল রপ্তানির ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বড় কোনো স্বস্তি মিলছে না। তবে গ্রেইন ইথানল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (GEMA)-এর পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশ নেপালের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যারা তাদের দেশে ১০ শতাংশ মিশ্রণ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখা যাচ্ছে ডিজেলে ইথানল বা বায়ো-আইবিএ (Bio-IBA) মেশানোর সম্ভাবনায়। প্রাজ ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ গাইকওয়াড জানিয়েছেন, তাঁদের বায়ো-আইসোবিউটানল প্রযুক্তি বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পেট্রোলের তুলনায় ডিজেলের চাহিদা দেশজুড়ে বহু গুণ বেশি। ফলে ডিজেলে মাত্র ২ শতাংশ বায়ো-আইবিএ মেশানোর নিয়ম চালু হলেও আগামী দিনে ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের নতুন প্রকল্পের বিশাল সুযোগ তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, এই মেগা সংকট কাটিয়ে ভারতীয় জৈবজ্বালানি শিল্প কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার।