“ডিজেলে নয়, এবার এলএনজিতে ছুটবে ট্রেন!” দেশের প্রথম সবুজ ট্রেনের যাত্রা শুরু করছেন অমিত শাহ

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের দিকে আরও এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করল ভারতীয় রেল। হাইড্রোজেন ট্রেনের সফল অগ্রগতির পর এবার দেশের প্রথম এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) চালিত ট্রেনের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হতে চলেছে। ডিজেলের ওপর দেশের রেল পরিবহনের নির্ভরতা কমাতে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। রবিবার গুজরাটের সবরমতী স্টেশনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই নবাবিষ্কৃত ট্রেনের চলাচলের সূচনা করতে চলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। একই সঙ্গে তিনি প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের একাধিক রেল প্রকল্পেরও উদ্বোধন করবেন।

নতুন প্রযুক্তির নেপথ্যে কী রয়েছে?
আহমেদাবাদ রেলওয়ে ডিভিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় রেল এই প্রথমবার ট্রেনের ড্রাইভিং পাওয়ার কারে (DPC) এলএনজি ভিত্তিক ডুয়েল-ফুয়েল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এই বিশেষ ইঞ্জিনের বিশেষত্ব হলো, এটি প্রয়োজনে এলএনজি এবং ডিজেল—উভয় মাধ্যমেই চলতে সক্ষম। অর্থাৎ, জ্বালানির লভ্যতা বা সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ইঞ্জিনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এলএনজি থেকে ডিজেলে সুইচ করতে পারবে। ফলে মাঝপথে জ্বালানি সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না ট্রেনটিকে।

এই প্রজেক্টের আওতায় রেল কর্তৃপক্ষ ১,৪০০ হর্সপাওয়ার (HP) ক্ষমতার দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কারকে এলএনজি-ডিজেল সিস্টেমে সফলভাবে রূপান্তরিত করেছে। ইতিমধ্যেই এই রূপান্তরিত ডিপিসিগুলি প্রায় ২,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি ফিল্ড ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। নতুন এই প্রযুক্তির কার্যক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পরেই এটিকে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলের অনুমান, এই অভিনব ব্যবস্থার ফলে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।

কীভাবে কাজ করবে এলএনজি সিস্টেম?
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি ডিপিসিতে প্রায় ২,২০০ লিটার ক্ষমতার একটি বিশেষ এলএনজি ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে। এই ট্যাঙ্কে প্রায় ৯৫০ থেকে ১,০০০ কেজি ব্যবহারযোগ্য এলএনজি মজুত রাখা সম্ভব। একবার সম্পূর্ণ এলএনজি ভরলে ট্রেনটি অনায়াসে প্রায় ৪৪৪ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রান্ত করতে পারবে। এর ফলে বারবার জ্বালানি ভরার ঝক্কি অনেকটাই কমে যাবে।

পাশাপাশি, পরিবেশ দূষণ হ্রাসের ক্ষেত্রেও এই ট্রেনটি বিপ্লব আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। কার্বন ডাই অক্সাইড (CO₂), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) এবং ক্ষতিকারক পার্টিকুলেট ম্যাটারের (PM) মাত্রা কমিয়ে সবুজ রেল পরিবহণকে উৎসাহিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

সাশ্রয় হবে বিপুল অর্থ
পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও এই প্রকল্প অত্যন্ত লাভজনক হতে চলেছে। সাধারণ ডিজেলের তুলনায় এলএনজির দাম কম হওয়ায় রেলের পরিচালন খরচ অনেকটা কমবে। রেলের প্রাক্কলন অনুযায়ী, একটি ডিপিসি ব্যবহারের ফলে বার্ষিক প্রায় ১১.৯ লক্ষ টাকা সাশ্রয় হবে। আর যদি ৮টি কোচের একটি রেক ব্যবহার করা হয়, তবে বছরে আনুমানিক ২৩.৯ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা, এলএনজি ডুয়েল-ফুয়েল সিস্টেমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সাধারণ ডিজেল ইঞ্জিনের মূল শক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করতে না হয়। ট্রেনের পারফরম্যান্স সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখেই জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোর এই অনন্য উদ্যোগ আগামী দিনে ভারতীয় রেলকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *