১৫ কোটির সোনা কি সত্যিই দাদা-দাদির? আয়কর হানার পরেই আদালতের মেগা রায়ে তুমুল চর্চা

আয়কর দপ্তরের তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া প্রায় ১৫ কোটি টাকার গহনা ও মূল্যবান ধাতু নিয়ে এক বড়সড় রায় দিয়েছে আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনাল (ITAT)। বাজেয়াপ্ত করা ওই গহনার একটি বড় অংশ পৈতৃক এবং দাদা-দাদির সম্পত্তি বলে দাবি করেছিলেন মিরাজ দিগ্বিজয় শাহ নামের এক ব্যক্তি। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর ট্রাইব্যুনাল সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ওই গহনাগুলির ওপর আরোপিত কর মওকুফ করা হবে। তবে এই রায়কে ঘিরে করদাতাদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে: ২০২২ সালের ২১শে জুন আয়কর দপ্তর মিরাজ দিগ্বিজয় শাহের বাড়ি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ অভিযান চালায়। তল্লাশিতে প্রায় ১৪.৬৯ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ সোনা, হিরে ও বুলিয়ন উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। মূল বিবাদের বিষয় ছিল ৩,২৩৩.১১ গ্রাম ওজনের প্রায় ১.৫৬ কোটি টাকা মূল্যের গহনা।
মিরাজ শাহের দাবি ছিল, এই গহনাগুলি তাঁর ব্যক্তিগত বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি নয়। বরং এগুলি তাঁর প্রয়াত দাদা, দাদি, বাবা এবং তাঁদের হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের (HUF) পৈতৃক মালিকানাধীন।
কীভাবে প্রমাণ হলো গহনাগুলির উৎস? এই মামলার সবচেয়ে বড় মোড় ছিল লকারের মালিকানা। তদন্তে দেখা যায়, বিতর্কিত গহনাগুলি মিরাজের ব্যক্তিগত কোনো লকারে ছিল না। বরং সেগুলি তাঁর মা, প্রয়াত বাবা, দাদা, ভাই এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের নামে থাকা ইউকো ব্যাংকের বিভিন্ন লকারে রাখা ছিল। এমনকি গত ৫-৭ বছর ধরে ওই লকারগুলিতে যাননি মিরাজ।
নথিপত্র যাচাইয়ের সময় ১৯৯৭ সালের একটি পুরনো মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেন করদাতা। আপিল কর্তৃপক্ষ দেখতে পান, সেই পুরনো রিপোর্টের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া গহনাগুলির বিবরণ পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। পাশাপাশি মিরাজের মা তাঁর নিজ নামে থাকা গহনাগুলির মালিকানা দাবি করে একটি হলফনামাও জমা দেন। এই সমস্ত অকাট্য প্রমাণ এবং লকারের মালিকানা খতিয়ে দেখে কলকাতার আইটিএটি বেঞ্চ ১.৫৬ কোটি টাকার গহনাকে অঘোষিত সম্পদ হিসেবে গণ্য করতে অস্বীকার করে এবং কর মওকুফের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অনুরূপভাবে, ৬৪.৯৩ লক্ষ টাকা মূল্যের আরেকটি গহনার মামলার ক্ষেত্রেও একই রায় বহাল রাখা হয়েছে।
পৈতৃক সোনা মানেই কি করমুক্ত? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের অর্থ এই নয় যে বাড়িতে থাকা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত পৈতৃক সোনা বা গহনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যাবে। এই বিশেষ মামলায় পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক নথি, লকারের মালিকানার সঠিক তথ্য এবং পুরনো মূল্যায়ন প্রতিবেদন থাকায় করদাতা আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন। তাই ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে পৈতৃক গহনা বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে ক্রয়ের রশিদ, পুরনো মূল্যায়ন রিপোর্ট, উইল কিংবা পারিবারিক বন্দোবস্তের মতো আইনি নথিগুলি নিরাপদে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন কর বিশেষজ্ঞরা।